ফকির চাঁদ

লেখক : শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় 

ফকিরচাঁদ যে একজন অতি সন্দেহজনক লোক তাতে কারও কোনও সন্দেহ নেই। গঙ্গানগর গাঁয়ের শেষপ্রান্তে যে খালটা রয়েছে তার ধার ঘেঁষেই ফকিরের বাড়ি। বাড়ি বলতে যা ঠিক সেরকম নয়। বাঁশ বাঁখারি দিয়ে বানানো ঘর, গোলপাতার ছাউনি, নিতান্তই হতদরিদ্র অবস্থা। সেখানেই ফকিরচাঁদ দিব্যি আপনমনে থাকে। মুখভর্তি কালো কুচকুচে দাড়ি-গোঁফ, পরনে আলখাল্লার মতো একটা বেঢপ পোশাক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। লোকে তাকে সাধু ভেবে গিয়ে অনেক সময়ে হাত দেখাতে চায়, তাবিজ-কবচ চায়। ফকিরচাঁদ তাদের সটান তাড়িয়ে দেয়। সে বলে, আমি সাধু সিদ্ধাই নাই বাপু, আমি একজন বৈজ্ঞানিক।

তা ফকিরচাঁদ বৈজ্ঞানিকই বটে।

সকালবেলা আলো ফুটবার আগেই সে একখানা থলি নিয়ে বেরিয়ে খালের ওধারে জঙ্গলে গিয়ে ঢোকে। সেখান থেকে রাজ্যের পাতা, ফল, শেকড়বাকড় তুলে নিয়ে আসে। তারপর হামানদিস্তায় থেঁতো করে তাতে কিসব মেশায় কে জানে। তার ঘরে কাঠের তাকে সারি সারি শিশিতে সেইসব পাতার তৈরি তরল ওষুধ, বড়ি, গুঁড়ো ভরা। সেগুলো কার কোন কাজে লাগবে তা কেউ জানে না। ফকিরও কাউকে ডেকে কখনও বলেনি যে, আমার ওষুধ খেয়ে দেখ। সে কারও কাছ থেকে কিছু চায়ও না। তবু যে তার পেট চলে তার কারণ হল, চাষীবাসীরা তাকে একটু ভয়-ভক্তি করে বলে প্রায় রোজই কিছু না কিছু সিধে দিয়ে যায়। কিন্তু ফকিরচাঁদের তাতে কোনও হেলদোল নেই। ভারী নির্বিকার মানুষ।

সনাতন বিশ্বাসের বড় পাজি হাঁপানি রোগ আছে। বহু চিকিৎসাতেও কোনও কাজ হয়নি। গাঁয়ের ডাক্তার কবিরাজ ফেল করাতে সনাতন বড় গঞ্জ শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে। বিস্তর ওষুধেও কোনও কাজ হয়নি বলে সনাতনের জীবনের ওপর মায়াটাই চলে গেছে। এই রোগ নিয়ে বেঁচে থাকাটাই তো কষ্টকর। অনেক ভেবেচিন্তে সনাতন একদিন বিকেলে গিয়ে ফকিরের ঘরে হানা দিল।

ফকির আছিস নাকি?

ফকির হাঁক শুনে বেরিয়ে এল। মুখে বিরক্তি, ভ্রূ কোঁচকানো। বাজখাঁই গলায় বলল, কি চাই?
ওরে আমি তো হাঁপানিতে মরতে বসেছি। কোনও ওষুধেই কাজ হচ্ছে না। বলি তুই কি হাঁপানির ওষুধ জানিস?

জবাব না দিয়ে ফকির ঘরের ভিতরে ঢুকে একটা শিশি নিয়ে এসে সনাতনের হাতে দিয়ে বলল, এটা সকালবেলা এক ছিপি খেয়ে নেবেন। রোজ।

শিশির গায়ে কোনো লেবেল নেই। খুব ভয়ের চোখে শিশিটার দিকে চেয়ে সনাতন বলল, ওরে, এতে কোনও বিষ- টিষ নেই তো। খেলে কিছু খারাপ যদি হয়।

ফকির নির্বিকার মুখে বলে, সে আমি জানি না। খারাপও হতে পারে। কোনও গ্যারান্টি নেই।

এটার দাম কত?

তাও জানা নেই মশাই।

সনাতন দোলাচল মন নিয়ে বাড়ি ফিরল।

ফকিরচাঁদের ওষুধের কথা শুনে বাড়ির সবাই রে রে করে উঠল, - খবরদার, ওই পাগলের ওষুধ খেও না। মারা পড়বে।

সনাতনও ভয় পেয়ে খেল না। তবে শিশিটি রেখে দিল। কিন্তু হাঁপানির কষ্ট মাঝে মাঝে এমন তুঙ্গে ওঠে যখন মনে হয় এর চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।

তাই দিন তিনেক পরে একদিন মাঝরাতে উঠে মরিয়া হয়ে সে এক ছিপি ওষুধ খেয়ে নিল। স্বাদ একটু তেতো তেতো, আর গন্ধটাও খুব একটা ভালো নয়। খেয়ে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইল। বিষক্রিয়া হয়েছে কিনা বুঝতে চেষ্টা করল। কিন্তু তেমন কিছু খারাপ প্রতিক্রিয়া হল না দেখে সে একটু নিশ্চিন্ত হল। একটু ঘুমিয়েও পড়ল।

সকালে যেন মনে হল হাঁফের টানটা একটু কম। তবে সেটা মনের ভুলও হতে পারে। কিন্তু সকালে আর এক ছিপি ওষুধও খেয়ে নিল সে। সারাদিন আর কিছুই ঘটল না। কিন্তু রাতে সনাতনের ভারী সুনিদ্রা হল। হাঁপানির জন্য ঘুমোতেই পারত না এতদিন।
সকালে উঠে সে অবাক হয়ে বুঝতে পারল, তার হাঁফের টান এক্কেবারে নেই। নেই তো নেই। কোনওদিন যে ছিল সেটাই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।

এই ঘটনার পর গাঁয়ে একটা মৃদু শোরগোল পড়ে গেল। তবে কি পাগলটার সত্যিই কোনও বিদ্যে জানা আছে?

ডাক্তার নগেন সরকার শুনে বলল, হুঁ, হাতিঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল। ফকরেটা তো লেখাপড়াই জানে না।

সনাতন ফুঁসে উঠে বলে, দেখ ডাক্তার, হাঁপানি সারাতে তোমার পিছনে আমি কয়েক হাজার টাকা ঢেলেছি। লাভ হয়েছে লবডঙ্কা। ফকরে তো তার ওষুধের জন্য একটা পয়সাও নেয়নি।

নগেন বলল, ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে। ঠিক আছে, আমার মায়ের তো পেটে টিউমার ধরা পড়েছে। সামনের মাসেই অপারেশন। খরচের ধাক্কাও কম নয়! সারাক দেখি আপনার ফকিরচাঁদ আমার মায়ের টিউমার!

ফকিরকে পরদিনই দুপুরবেলা ধরে বেঁধে নিয়ে আসা হল। ফকির সব শুনে তার ঝোলা থেকে একটা শিশি বের করে দিয়ে বলল, রোজ সকালে এক ছিপি করে।

তাতে সারবে তো?

তা কে জানে? ওসব আমি জানি না। ওষুধ চেয়েছো, দিয়েছি।

যদি ওষুধ খেয়ে রুগি মারা যায়?

যেতেও পারে। ভয় পেলে খাইও না। তোমাদের ইচ্ছে।

নগেনের মা বললেন, না বাবা, তোমাকে আমার বিশ্বাস হয়। আমি খাবো।

তিনদিন ওষুধ খাওয়ার পর মা বললেন, ওরে নগেন, আমার পেটের ভিতর সেই চাকাটা যেন নেই বলে মনে হচ্ছে।

নগেন ডাক্তারও পেট টিপে দেখল, নেই। সন্দেহভঞ্জনের জন্য শহরে নিয়ে এক্স-রে, ইউ এস জি করে দেখা গেল, সত্যিই নেই।

পরদিন সকালেই ফকিরের ঘরের দরজায় গিয়ে হামলে পড়ল নগেন ডাক্তার, ও ফকির, তোমার টিউমার সারানোর ফরমুলাটা আমাকে দাও ভাই, আমি তোমাকে হাজার টাকা দিচ্ছি।

ফকির খ্যাঁক করে উঠল, কিসের ফরমুলা? কিসের টিউমার। যাও যাও, ঘ্যানঘ্যান কোরো না।

আচ্ছা, না হয় পাঁচ-নয়, দশ হাজার টাকাই দেবো।

তোমার টাকা বেশি হয়ে থাকলে গরিব-দুঃখীর বিনা পয়সায় চিকিৎসা করো না কেন। এখন বিদেয় হও তো।

ভজহরি গুণের কর্কট রোগ। ডাক্তার জবাব দিয়েই রেখেছে। বড়জোর আর ছ'মাস আয়ু। অথচ তার বয়স বেশি নয়, মাত্র বত্রিশ। এ বয়সে কে মরতে চায়। তাই হাল ছেড়ে ভজহরি শেষের দিন শুনছিল। এমন সময় তার বাবা বলল, ফকির পাগলার ওষুধে নাকি শক্ত ব্যামো সেরে যাচ্ছে। আমাদের ভজুর জন্য একটা শেষ চেষ্টা করে দেখলে হয় না? এখন তো দৈব ছাড়া উপায় নেই।

ফকিরকে বাবা বাছা বলে একদিন ধরে আনল ভজহরির বাবা। ফকির রুগী ভালো করে দেখল না, পরীক্ষা করল না. প্রশ্নও করল না। শুধু একটা শিশি বের করে দিয়ে বলল, রোজ সকালে দুটো করে বড়ি।

আর কিছু করতে হবে না? শুধু দুটো করে বড়ি খেলেই হবে।

হ্যাঁ। এর বেশি আমার কিছু জানা নেই।

ও বাবা ফকির, একটু ভরসা দিয়ে যাও, এই ওষুধে এই ব্যাধি সারবে তো?

সারবে কিনা তা আমিও জানি না। ইচ্ছে হলে খাওয়াবেন।

কারোই ওষুধে তেমন ভরসা হল না। তবে ভজহরি ওষুধটা নিয়মিত খেতে লাগল। দিন সাতেক পরে সে টের পেল, রোজ তার পেট আর পিঠ জুড়ে যে তীব্র ব্যথাটা মাঝে মাঝে হচ্ছিল সেটা আর হচ্ছে না। আরও সাতদিন দেখল সে। পেট শান্ত। ব্যথা নেই। ভজহরিকে নিয়ে তার বাবা ছুটল শহরে। ডাক্তার পরীক্ষা করলেন। ভ্রূ কোঁচকালেন। আরও কয়েকটা টেস্ট করতে বললেন। রেজাল্ট দেখে ফের ভ্রূ কুঁচকে চিন্তিত মুখে বললেন, আশ্চর্য! কোনও কারসিনোজেসিক ট্রেস নেই! কি করে হল বলুন তো! এরকম তো হয় না।

ভজহরি আর তার বাবা ফকিরচাঁদের কথা বিশদ বর্ণনা করল। ডাক্তার অবাক হয়ে বললেন, জরিবুটি! তাতে সেরেছে! চলুন তো, আমিও লোকটার কাছে যাবো।


এইভাবেই রোজ ফকিরচাঁদের ঘরের সামনে ভিড় বাড়তে লাগল। প্রথম অল্প অল্প ভিড়। তারপর বেসামাল ভিড়।

মিটিমিটি চোখে চেয়ে ফকিরচাঁদ ভিড় দেখে, আর ভাবে। কি ভাবে তা বোঝা যায় না। মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই।

কিন্তু হঠাৎ এক ঝড়বৃষ্টির রাতে ফকিরচাঁদ উধাও হয়ে গেল। পরদিন লোকজন গিয়ে দেখে, ফকিরচাঁদ তো নেই-ই, ঘরটাও কেৎরে হেলে পড়েছে।

সেই থেকে আর ফকিরচাঁদের কোনও খোঁজ নেই।

চকবেড়ের গোহাটায়

লেখক: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

চকবেড়ের গোহাটায় গরু কিনতে গিয়েছিল পানাই মণ্ডল। চকবেড়ে অঞ্চলটা তেমন চেনা নয় তার। যাতায়াতই নেই। তবে নামটা জানা ছিল। আর এই গোহাটাই পরগনায় সবচেয়ে বড়।

তার বউ বলে দিয়েছে, ওগো, আজকাল যে সব হাতির মতো বড় বড় জারসি গরু, পাঞ্জাবি গরু বেরিয়েছে ওগুলো কিনো না। ওই বিরাট গরু দেখলে বাপু ভয় করে। একটা লক্ষ্মীমন্ত দেখে দিশি গরু কিনে এনো। পানাই মণ্ডল গরুর মর্ম তেমন জানে না। এতকাল গাইগরু পোষার মতো অবস্থাই ছিল না তার! পর পর বছর চারেক ভালো বর্ষা হওয়ায় চাষটা কপালজোরে ভালোই হয়েছিল। তার ওপর নিমাই নস্কর নামে একটা চাষবাস পাশ করা ছোকরা এসে তাকে অকালের ফসল ফলানো শিখিয়েছে। সেইসব করে হাতে কিছু বাড়তি পয়সা চলে এল।

তাইতেই পাকা ঘর হল, একটা টিউবওয়েল বসাল, শ্যালো কিনে ফেলল, বউ ফুলুরানি বায়না ধরল, গরু না রাখলে বাড়ির লক্ষ্মীশ্রী আসে না। অতএব গরু একটা চাই।


তা সে আর বেশি কথা কি। ট্যাঁকে টাকা নিয়ে পানাই অগত্যা গোহাটায় চলে এসেছে। মুশকিল হল গরু সে ভালো চেনে না। তার জমি চাষ হয় ভাড়া করা ট্রাক্টরে। সুতরাং বলদ রাখারও ঝামেলা পোয়াতে হয়নি কোনও দিন। অভিজ্ঞতা না থাকলে ঠকে যাওয়া আর বিচিত্র কি।

সেই জন্য একজন জানবুঝওয়ালা লোককে সঙ্গে আনবে ভেবে পীতাম্বরকে ধরেছিল। কিন্তু পীতাম্বরের শাশুড়ির এখন-তখন অবস্থা, খবর পেয়ে সে জলেশ্বরে চলে গেছে। সুতরাং পানাই তার বড় শালা ঝিকুকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু ঝিকু বলল, জামাইদা, গরুর বিষয়ে আমার তেমন জ্ঞানই নেই।

তবু দুই আনাড়িতেই এসেছে আজ।

চকবেড়ের গোহাটায় ঢুকে তাদের চোখ তো চড়কগাছ। সমস্ত জায়গাটা গরু- গরু গন্ধে একেবারে ভোঁ ভোঁ করছে। তেমনই ধুলো উড়ছে। গোবর আর গোচোনায় একেবারে ভাসাভাসি ব্যাপার। তার সঙ্গে হাজারে হাজারে মাছি আর পোকামাকড় একেবারে চেপে ধরেছে চত্তরটাকে। ঝিকু নাকে রুমাল চাপা দিয়ে বলে ওঠে - ওরে বাবা, এ তো দেখছি নরক গুলজার!

শুধু গরু নয়! নামে গোহাটা হলেও পাঁঠা-ছাগলের ব্যাপারীরাও বিস্তর জড়ো হয়েছে। সুতরাং দিশাহারা অবস্থা। বিস্তর খদ্দেরেরও আগমন ঘটেছে। ব্যাপার দেখে একটু ঘাবড়ে গিয়ে পানাই বলে, ওরে ঝিকু, এ তো আমাদের বাঁশবনে ডোম কানা অবস্থা রে! কেউ কি আর আমাদের পাত্তা দেবে!

ঝিকু আনাড়ি হলেও চালাক-চতুর। তার ওপর বি এ পাশ করে এম এ পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে। বলল, লোকে যেন আনাড়ি বলে বুঝতে না পারে।

ঘোরাঘুরি করতে করতেই হঠাৎ একটা বেঁটেমতো লোক জুটে গেল সঙ্গে। চোখে-মুখে ভারী মোলায়েম গদগদ ভাব। চোখে ধূর্তামি। খুব মাখো মাখো গলায় বলল, গরু কিনবেন নাকি কর্তা? আমি হলুম গে লালমোহন, লোকে বলে গরুর জহুরি। তা কী গরু চাই? পছন্দসই যদি কিনিয়ে দিতে পারি তাহলে ওয়ান পারসেন্ট দালালি দিয়ে দেবেন।

পানাই একটু ভালো মানুষ গোছের, হয়তো রাজি হয়ে যেত, কিন্তু ঝিকু ফস করে বলে বসল, ওহে বাপু, আমাদের গরু নিয়েই কারবার, নবগ্রামে আমাদের গোশালা গিয়ে দেখে এসো, চোখ ট্যারা হয়ে যাবে।

লোকটা ভড়কাল না। বলল, তা তো বটেই। গোশালা যখন আছে তখন গরু চিনবেন বৈকি! তবে কিনা গোহাটায় অনেক বড় বড় গরুর ব্যাপারীও ঘোল খেয়ে যায় কিনা! গত হপ্তায় শিবেন মান্নার মতো পাকা লোককেও এক ব্যাপারী বুড়ো গরু গছিয়ে হাওয়া হল।

পানাই একটু ভয় খেয়ে বলল, তাহলে তো খুব ভাবনার কথা হে।

তা তো বটেই। তারপর ধরুন চোরাই গরুর ব্যাপার আছে, রোগী গরুর ব্যাপার আছে, বন্ধ্যা গরুর ব্যাপার আছে। গরু নিয়ে মহাভারত হয়ে যায় কর্তা। গত বিশটি বছর এই গোহাটার সঙ্গে লেপটে আছি। গো-শাস্ত্র এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

পানাই মণ্ডল বলল, তা তো বটেই।

ঝিকু বলল, ঠিক আছে, ভালো গরু দেখিয়ে দেবে চলো। ভালো গরু যদি সস্তায় পাই তাহলে দালালি নয় বাপু, পঞ্চাশটা টাকা দিতে পারি।

লালমোহন মাথা নেড়ে বলে, তা হবে না কর্তা। অত কমে পেরে উঠব না। দালালি করে খাই, আমারও ঘরে বৌ-বাচ্চা আছে, খরচাপাতি আছে, এই দালালিই সম্বল। আরও জনা কুড়ি দালাল নানা এলাকা ভাগ করে কাজকারবার করছে, লড়ালড়ি তো কম নয় মশাই!

গাইগুঁই করে পানাই নিমরাজি মতো হল। ঝিকু লোকটার সঙ্গে বিস্তর দরাদরি করে হাফ পারসেন্টে রাজি করাল।

তবে লালমোহন লোকটা বেশ কাজের। প্রথমেই যে ব্যাপারীর কাছে নিয়ে গেল সে লোকটাকে দেখলে মায়া হয়। ভারী দীন-দুঃখী চেহারা, দুটি ছোটো গরু নিয়ে হাটের একটা এক টেরে কোনায় সকলের চোখের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। গরু দুটোও ভারী ঠান্ডা, লোকটার মতোই।

দুটো গরুই ভারী পছন্দ হয়ে গেল পানাইয়ের। তার মধ্যে সাদায় বাদামি ছোপওলা গরুটা যেন তার দিকে চেয়ে চোখের ভাষায় কিছু বলতে চাইছিল।

সে ব্যাপারীকে বলল, এটির কত দাম নেবে গো ব্যাপারী?

রোগাভোগা মানুষটা ক্ষীণ গলায় বলে, যা ভালো বুঝবেন দেবেন।

ঝিকু আর লালমোহন মাঝখানে পড়ে বিস্তর ঝামেলা পাকিয়ে তুলল। লালমোহন বলল, ছ' হাজারে ছেড়ে দাও গো ব্যাপারী।

ঝিকু ফুঁসে উঠে বলল, তার মানে?

তুমি দর হাঁকবার কে হে বাপু? দালালি চাও সে পরে দেখা যাবে। দরদাম তো আমরা করব। তুমি দূরে গিয়ে দাঁড়াও।

লালমোহন বলল, এ গরুর দাম আট-দশ হাজারের নীচে নয় কিন্তু। তোমাদের ভালোর জন্যই বলছিলাম।

তোমাকে আর আমাদের ভালো দেখতে হবে না। আমাদের ভালো আমরা বেশ বুঝি।

লালমোহন যে সুবিধের লোক নয় তা বুঝে নিতে বেশি সময় লাগল না। কারণ লালমোহন বলে বসল, ব্যাপারীরা পেটের দায়ে অনেক সময় কম দামে গরু বেচে দেয় বটে, কিন্তু সেটা ধর্মত ন্যায্যত ঠিক নয়! গরুর একটা ধরাবাঁধা দাম তো আছে হে বাপু!

ঠিক এই সময়ে সবাইকে চমকে দিয়ে একটা গুরুগাম্ভীর কন্ঠস্বর বলে উঠল, দাম চার হাজার টাকা।

লালমোহন চমকে উঠে চারদিকে চেয়ে দেখল, তারপর রুখে উঠে বলল, চার হাজার! বললেই হল চার হাজার! কে বলল কথাটা শুনি?

কিন্তু কেউ কোনও সাড়াশব্দ করল না আর।

কাঁচুমাচু মুখে গরুর ব্যাপারী পানাইকে বলল, আজ্ঞে কর্তা, ওই চার হাজার দিয়েই গরুটা নিয়ে যান। বড় ভালো গরু।

পানাই বলল, তাহলে গরুটা বেচছো কেন হে? রেখে দিলেই তো পারতে।

লোকটা মাথা নেড়ে বললে, গরু তো আমার নয় বাবু। গরুর মালিক পরমেশ্বর রায়। তাঁর গোয়ালে অনেক গরু। গরু বেশি হলে বেচে দেন। আমি হলুম তাঁর রাখোয়াল। পয়সা থাকলে আমিই কিনে নিতুম মশাই। কিন্তু আমাকে বেচলেও চার হাজার টাকা উঠবে না। তবে বলে রাখছি বাবু, গরুটা হাতছাড়া করবেন না। আপনাকে দেখলে ভালো লোক বলে মনে হয়, তাই বলছি।

লালমোহন তড়পে উঠে বলল, ও তুমি পরমেশ্বর রায়ের রাখাল। দিনে দুপুরে তাকে ঠকাচ্ছো? দাঁড়াও, আজই পরমেশ্বরবাবুর কাছে গিয়ে তোমার নামে নালিশ জানিয়ে আসব।

ঝিকু তেড়ে উঠে বলল, তুমি কার দালাল বলো তো হে লালমোহন? আমাদের কাছে দালালি চাইছো, আর আসল দালালি করতে লেগেছে গরুর মালিকের? তুমি তো ফেরেববাজ লোক হে! দু'মুখো সাপ।

ফের সেই গমগমে গলাটা বলে উঠল, ও কিন্তু গরুচোর।

লালমোহন রাগে একটা লাফ দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, কে, কে বলল কথাটা। কার এত আস্পর্ধা?

কেউ অবশ্য টুঁ শব্দটিও করল না।

লালমোহন আগুন চোখে সকলের মুখের দিকে চেয়ে দেখে বলল, এ হাটে আমার সঙ্গে শত্রুতা করে কেউ পার পাবে না। এই গোহাটায় আমার কথাই আইন। এই গরুর দাম ছয় হাজার টাকার এক পয়সা কম নয়। কিনতে হয় কেনো, নইলে কেটে পড়ো।

ঝিকু ঘুষি পাকিয়ে বলে, বললেই হল?

পানাই মণ্ডল ভীতু মানুষ, তাড়াতাড়ি দুজনের মাঝখানে পড়ে বলল, হাঙ্গামায় কাজ নেই বাপু, গরু আমি আর কিনছি না। গরু কেনার এত ঝামেলা জানলে কে এত দূরের গোহাটায় আসত। ঘাট হয়েছে লালমোহনবাবু, আমি গরু নেবো না।

সঙ্গে সঙ্গে সেই গুরুগম্ভীর গলায় ফের যেন দৈববাণী হল, ও গরু তোমার। নিয়ে যাও। লালমোহন পাজি লোক।

লালমোহন দিশাহারার মতো চারদিকে চাইল। কিন্তু কথাটা কার মুখ থেকে বেরোল সেটা বুঝতে পারল না। চারদিকে বিস্তর ক্রেতা-বিক্রেতা, ফড়ে দালালের ভিড়, গোলমালে কান পাতা দায়। এর মধ্যে এই বাজ ডাকা গলায় কে মাঝে মাঝে কথা কয়ে উঠছে তা সে বুঝতে পারছে না।

হঠাৎ মস্তানি ঝেড়ে ফেলে সে পানাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, দিন মশাই, ওই চার হাজার দরের কমিশনটা দিয়ে ফেলুন তো। তারপর গরু নিয়ে চলে যান।

পানাই গোলমাল এড়ানোর জন্য ট্যাঁকে হাত দিয়েছিল টাকাটা দিয়ে ফেলবে বলে। কিন্তু আচমকাই শান্ত, ছোটোখাটো গরুটা এগিয়ে এসে দুম করে একটা প্রবল ঢুঁসো মেরে দিল লালমোহনকে। ডিগবাজি খেয়ে পড়ে লালমোহন "বাবারে" বলে চেঁচিয়ে চোখ উল্টে ফেলল।

গরুর ব্যাপারী ভারী অবাক হয়ে বলল, বড় আশ্চর্য কাণ্ড মশাই। সাবিত্রী বড় ঠান্ডা স্বভাবের গরু। কখনও কাউকে ঢুঁ দেয়নি আজ অবধি। তা যাই হোক, এসব কাণ্ড দেখে বড় ঘাবড়ে গেছি। গরু আপনিই নিন।

খুশি মনে টাকা গুনে দিয়ে সাবিত্রীকে নিয়ে হাট ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল পানাই। মাঠের ভিতর হাঁটা পথ ধরে পানাই বলল, হ্যাঁরে ঝিকু, কাণ্ডটা কিছু বুঝলি?

ঝিকু মাথা নেড়ে বলল, না জামাইদা, অশৈলী কাণ্ড। কথাগুলো কে বলল বলো তো!

ঠোঁট উল্টে পানাই বলল, কিছুই বুঝলুম না, মনে হল দৈববাণী-টেববাণী কিছু হচ্ছে, একটু ভয়-ভয় করছে যেন।

তা আমারও কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। কিন্তু জামাইদা, চারদিকটা কেমন হঠাৎ থম মেরে গেছে দেখছো?

তাই তো রে। আকাশের রংটাও তো ভালো নয়। ঝড় আসবে বুঝি। ঘূর্ণিঝড় এলে এরকমটা হয়। এত বড় ফাঁকা মাঠে ঝড়ের মুখে পড়লে যে বিপদ হবে রে!

ছোটো জামাইদা।

ছোটার কি উপায় আছে! গরুটা রয়েছে না!

গরুটা তোমার ট্যাঁটন আছে জামাইদা। লালমোহনকে কেমন ঢুঁসোটা মারল বলো!

সেইটেও চিন্তার কথা রে! এত ঠান্ডা স্বভাবের গরু হঠাৎ এমন ক্ষেপে গেল কেন বল তো!

গরুটা এলেবেলে গরু নয় জামাইদা।

কিন্তু পা চালাও, ঝড়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছো? উড়িয়ে নিয়ে যাবে কিন্তু!

খোলা মাঠে ঝড়টা একেবারে উন্মাদের মতো ধেয়ে আসছিল। দূর থেকেই তার ডাকাতের মতো হুঙ্কার শোনা যাচ্ছিল। সঙ্গে একটা গুম গুম মেঘ ভাঙা আওয়াজ আর বাজের ঝিলিক।

হঠাৎ দড়িতে একটা হ্যাঁচকা টান পড়ায় পড়ো-পড়ো হয়ে ছুটতে লাগল পানাই। চেঁচিয়ে বলল, ঝিকু, ধর আমাকে, গরুটা পালাচ্ছে যে।

ঝিকু এসে তার একটা হাত চেপে ধরল বটে, কিন্তু আটকাতে পারল না।

গরুর টানে দুজনেই প্রাণপণে ছুটতে লাগল এবড়ো-খেবড়ো মাঠের ওপর দিয়ে। প্রচণ্ড বাতাস আর ধূলোয় দিক ঠিক রইল না। একটা ছোটোখাটো গরুর গায়ে যে এত জোর আর এত বেগে ছুটতে পারে সেটা তাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না।

কিন্তু ঝড়টা তাদের পেড়ে ফেলার আগেই সেই গরুটা মাঠটা আড়াআড়ি পার হয়ে একটা পোড়ো বাড়ির মধ্যে এনে ফেলল তাদের। চারদিকে বড় বড় গাছ। তাতে আড়াল হওয়া একটা পড়ো-পড়ো বাড়ি। তবে দেউড়ির পর একখানা দালান গোছের জিনিস দাঁড়িয়ে আছে। শালা-ভগ্নীপোত গরু সমেত ঢুকে পড়ল সেখানে। আর তখনই বাইরে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ল। কয়েকটা গাছ উপড়ে প্রায় উড়ে গিয়ে দূরে আছড়ে পড়ল। ঘরটাও থরথর করে কেঁপে উঠছিল বাতাসের ধাক্কায়। ভারী হতভম্ব হয়ে তারা দাঁড়িয়ে রইল শুধু।

ঝড় যখন থামল তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। বাইরে বেরিয়ে কিন্তু, তারা কোথায় এসেছে আর কোনদিকে গেলে গাঁয়ে পৌঁছোনো যাবে তা ঠাহর করতে পারল না। অন্ধকারে চারদিকটা একদম লেপাপোঁছা।

ওরে ঝিকু, এ তো বড় বিপদেই পড়া গেল।

তাই তো জামাইদা! এই অন্ধকারে কোনদিকে যাওয়া যায়?

হাতের দড়িতে মৃদু টান পড়তেই হাঁটতে হাঁটতে পানাই বলল, আয় ঝিকু, সাবিত্রীর পিছু পিছু যাই চল। ঝড়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। কি জানি বাপু, গরুটা বোধহয় সাক্ষাৎ ভগবতী।

আশ্চর্যের বিষয়, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই গরু নিয়ে তারা গাঁয়ের চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়তে পারল।

ঝিকু, সাবিত্রী কি করে আমাদের গাঁ চিনল বলতে পারিস?

না দাদা, আমার মাথা ঝিমঝিম করছে।

বাড়ি আসতেই শাঁখ আর উলুধ্বনি দিয়ে পানাইয়ের বউ গরুকে বরণ করে চাল কলা আরও কি সব মেখে খেতে দিল। বাচ্চারা এসে গরুর গায়ে হাত বুলোতে লাগল।

পানাই বলল, লক্ষ্মী গরু চেয়েছিলে, কপালজোরে তাই মিলিয়ে দিয়েছেন ভগবান। মা লক্ষ্মীকে পেন্নাম করো সবাই।

সাবিত্রী ভারী খুশি হয়ে ডাক ছাড়ল, হাম্বা।

গজদানব


মোহন সর্দার স্তম্ভিত হয়ে গেল লোকটাকে দেখে!

নাঃ! একটা কিছু করা দরকার। আর দেরী করা চলে না।

লোকটার সর্বাঙ্গে রক্তের ছোপ, ধুতি ফালা-ফালা। বললে, ওর একজন সঙ্গীও ছিল। অভয়ারণ্যের সীমান্তের বাইরে দিয়েই দুজন হাটের পথে যাচ্ছিল। একেবারে বিনা নোটিসে জঙ্গল থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে গজদানব। বিনা প্ররোচনায়। ওর সঙ্গীটির দেহ একেবারে কাদার দলায় রূপান্তরিত। লোকটা কোনক্রমে পালিয়ে এসেছে ছুটতে ছুটতে। মোহনসর্দারকে খবর দিতে।

কূকাল অভয়ারণ্যের ওয়ার্ডেন মোহন সর্দার রীতিমত বিচলিত হয়ে পড়ে। কূকাল ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারিতে তার সতেরো বছরের চাকরি। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা তার কখনো হয়নি। সরকারী হিসাবমত এ অরণ্যে সাতান্নটি বন্যহস্তী আছে। তারা আপন মনে থাকে। কখনো অরণ্যসীমানার বাইরে আসে না, কখনো মানুষজনকে আক্রমণ করে না। সরকারী কর্মীদের সঙ্গে তাদের হামেশাই দেখা হয়। কোন হাতিই কখন কাউকে তেড়ে আসেনি।

এই গজদানব এক ব্যতিক্রম!

মোহন সর্দার প্রশ্ন করে, - ও যে 'গজদানব' তা তুমি বুঝলে কেমন করে?

- ওর দাঁত জোড়া দেখে।

হ্যাঁ, দাঁত জোড়া হচ্ছে গজদানবের আইডেন্টিফিকেশন মার্ক! দশ-বিশখানা গাঁয়ের মানুষ তাকে দেখলেই চেনে। ঐ দাঁতের জন্য। সবাই ওর নাম দিয়েছে গজদানব।

দু-পাশের দুটি দাঁত বে-কায়দায় বাড়তে বাড়তে যেন পরস্পরকে স্পর্শ করেছে। ডক্টর রমেশচন্দ্রজী বলেছেন, ঐ দাঁত-জোড়ার জন্যেই একান্তচারী শান্ত হাতিটা মত্ত মাতঙ্গ হয়ে পড়েছে। দু পাশের দুটি দাঁত এমনভাবে বেঁকেছে যে, তার ফাঁক দিয়ে সে শুঁড়টাকে গলাতে পারছে না।

তার ফলে শুঁড়ের ডগা মুখের কাছে আসছে না আর। মাটি থেকে কিছু তুলে অথবা উঁচু গাছের ডালপালা ভেঙে সে খাবার মুখে পুরতে পারছে না! বেচারি গজদানব! বস্তুত অনাহারেই সে ক্ষিপ্ত!

এই সহজ কথাটা অঞ্চলপ্রধান বিনায়করাম বুঝতে নারাজ।

পঞ্চায়েত-বৈঠকে স্থির হয়েছে ঐ হাতিটাকে হত্যা করে অভয়ারণ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে! এই নিয়ে গজদানব চার-চারটি গ্রাম্য-মানুষকে হত্যা করল এবং চারবারই অভয়ারণ্যের সীমার বাইরে এসে। ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির যাবতীয় বন্যপ্রাণী, অভয়ারণ্যের সীমানা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।

না জেনে বা ভুল করে কেউ সেই সীমানা অতিক্রম করে না। একমাত্র ব্যতিক্রম ঐ গজদানব। সে বারে বারে নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করে ঢুকে পরে আশপাশের গাঁয়ে। তার একমাত্র লক্ষ্য কলার গাছ। দশ-মাইলের মধ্যে, তাই কেউ সাহস করে কলার চাষ করে না!

এ নিয়েও মোহন সর্দার আলোচনা করেছে রমেশচন্দ্রজীর সঙ্গে। রমেশচন্দ্র সদর শহরের পশুচিকিৎসক। মোহনের সঙ্গে ছিল চন্দন, মোহনের সতের বছর বয়সের কৌতূহলী ছেলেটা।

সেই হঠাৎ বেমক্কা প্রশ্নটা পেশ করে বসেছিল, আচ্ছা ডাক্তার-সাব, ঐ পাগলা হাতিটা কলাগাছের নেশায় এমন মাতাল হয়ে পড়ে কেন?

ডাক্তারসাব বলেছিলেন, বুঝলি না? ওর শুঁড় তো মুখের কাছে আসে না? তাই। কলাগাছ উপড়ে নিতে পারলে ওকে অনাহারে থাকতে হয় না। সেটাকে এমন ভাবে শুঁড়ে জড়িয়ে নিতে পারে যাতে দূর থেকেই গাছটার অপরপ্রান্ত ওর মুখের কাছাকাছি চলে আসে।

যুক্তিপূর্ণ কথা। মোহন বুঝতে পেরেছিল। বোঝেননি বিনায়করাম। নিতান্ত অবুঝের মত বলেছিলেন, - ওসব জানি না। ঐ পাগলা হাতিটা এ তল্লাটের বদনাম করে ছেড়েছে। মানুষজন সাহস করে পথে বের হয় না। আমরা চাই ওটাকে মেরে এ রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে।

মোহন সর্দার গড়িমসি করছিল এতদিন। দেশে পঞ্চায়েত-রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; অঞ্চলপ্রধানের ইচ্ছা মানেই আদেশ। কিন্তু ঐ অতবড় প্রাণীটাকে হত্যা করতে.....

চতুর্থ নরহত্যার পর মোহন বাধ্য হয়ে উপর মহলে গজদানবকে হত্যা করার অনুমতি চেয়ে পাঠাল।

অচিরেই এসে গেল তা। বস্তুত উপর মহল সব খবরই জানতেন, বিনায়করামের কৃপায়। তাঁরা চাইছিলেন, মোহন সর্দার নিজে থেকেই ঐ অনুমতি চেয়ে পাঠাক!

কারণ বনবিভাগের মন্ত্রীমশাই প্রাণীহত্যার একেবারে বিরুদ্ধে। দরখাস্তটা নিচুমহল থেকে এলে কনজারভেটারের দায়িত্বটা কমে।

হত্যার পারমিট এসে যাবার পর চন্দন এল বাপের কাছে দরবার করতে। গজদানবের পক্ষ নিয়ে। মোহন বিরক্ত হল। বললে, - আমি কী করব? আমি কী করতে পারি?

তা বটে! চন্দন বাপকে চেনে। জানে, এ অরণ্যের প্রতিটি বন্যপ্রাণীকে মোহন প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। নিতান্ত নিরুপায় হয়েই সে এই হত্যাদেশ আনিয়ে নিয়েছে।

পরদিন ভোর রাত্রে ওরা তিনজনে তিন-তিনটে রাইফেল লোড করে বার হয়ে পড়ল গজদানবের সন্ধানে। মোহন, চন্দন আর আলাগিরি। আলাগিরি বনরক্ষক। দুর্দান্ত সাহসী, অদ্ভুত তার টিপ। ইংরাজি V অক্ষরের নকশা এঁকে আকাশে যখন যাযাবর পাখির দল উড়ে যায় তখন সে বলে-বলে তিন বা চার নম্বর পাখিটাকে নামাতে পারে।

তখনও ভাল করে ভোরের আলো ফোটেনি! পুব আকাশে দপদপ্ করে জ্বলছে ভুলকো তারাটা! গজদানবের সন্ধান পেতে খুব দেরি হল না। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একা-একা চরে বেড়াচ্ছে।

মোহন জানে, কোন্ পথে হাতিটা নেলী-ওদাই ঝরনায় জলপান করতে যাবে! ভোর রাতে হাতিরা একবার আকণ্ঠ জল পান করে।

ঝরনার কিনারে আছে প্রকাণ্ড একটা 'পার্চিং-স্টোন'! নিঃসঙ্গ প্রস্তর, অন্তত ছয় মিটার উঁচু! এরা তিনজনে অনেক কায়দা করে সেই দোতলা বাড়ির মত উঁচু পাথরটার মাথায় উঠে এল। সেখানে উঠে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে মোহন গজদানবকে ভাল করে দেখল।

ডাক্তার-সাব যা বলেছিলেন সেটাই ঠিক। গজদানবের শুঁড় দুই দাঁতের ফাঁক দিয়ে মুখ-বিবর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। ও আরও দেখল, শুঁড়ের পাশ ছড়ে গেছে, রক্ত ঝরছে, নিজেরই দাঁতের ঘর্ষণে!

বেলা বাড়ল। গজদানব নদী কিনারে এল না। ক্রমে রোদের তেজ বাড়ল। প্রভাতী পাখির ডাক থেমেছে অনেকক্ষণ। তারপর প্রায় মধ্যদিনে গজদানব হেলতে-দুলতে নদীর দিকে এগিয়ে গেল। একদল হরিণ তার আগেই নদীকিনারে জলপান করতে এসেছিল। হরিণ হাতিকে ভয় পায় না। দু-জনেই তৃণভোজী, খাদ্য-খাদক সম্পর্ক নয়!

কিন্তু গজদানবকে দেখামাত্র হরিণের দল রুদ্ধশ্বাসে ছুটে পালিয়ে গেল। ওরাও কী জানি কী করে বুঝে নিয়েছে গজদানব ফাঁসির আসামী! সে স্বাভাবিক বন্যপ্রাণী নয়।

হঠাৎ গজদানব চঞ্চল হয়ে ওঠে! শুঁড় আকাশে তুলে বাতাসে কিসের গন্ধ শুঁকল। পরমুহূর্তেই সে বুঝে নিল জঙ্গলে মানুষ এসেছে! বুঝতে পারল তারা কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। ভীম বেগে সেই পাথরটার দিকে ছুটে এল গজদানব। পাথরটার ওপর একটা পা রেখে উপরে উঠবার চেষ্টা করল। পারল না।

সর্বশক্তি দিয়ে প্রচণ্ড ধাক্কা মারল পাথরটায়! তিলমাত্র নড়ল না সেই অনাদিকালের অনড় প্রস্তরখণ্ড!

গজদানব ওদের কাছ থেকে দু-আড়াই মিটার দূরত্বে! আলাগিরি তার রাইফেলটা উঁচু করে ধরতেই মোহন চাপা গর্জন করে ওঠে, - মৎ মারো।

আলাগিরি অবাক হয়। কিন্তু আদেশটাও মানে। রাইফেলটা নামায়।

একটা অদ্ভুত জিনিস নজরে পড়েছে মোহন সর্দারের। হাতিটার গজকুম্ভের ডানপাশে একটা ক্ষতচিহ্ন। প্রচণ্ড উত্তেজনায় গজদানব যখন কান নাড়াচ্ছে, তখন সেই ক্ষতচিহ্নটা দেখা যাচ্ছে।

মোহন আন্দাজে বুঝে নেয়, গজদানব যখন কোন গ্রামে কদলীবৃক্ষের সন্ধানে গিয়েছিল তখন কেউ ওকে গুলি করেছে! হয়ত বাক্-শট্, হয়ত নিতান্ত গাদা-বন্দুক!

সে যাই হোক, কানের পাশে নরম চামড়া ভেদ করে বুলেটটা এখন রয়েছে ওর দেহে। ঘা হয়েছে তাই। দগদগে ঘা। পূঁজ গড়াচ্ছে কান বেয়ে!

সন্ধ্যেবেলায় ওরা যখন ফিরে এল, তখন আলাগিরি জানতে চায়, এমন সুযোগটা পেয়েও কেন হাতিটাকে মারতে দিল না মোহনসর্দার।

মোহন বিস্তারিতভাবে জানাল - সে কী দেখেছে, কী বুঝেছে!

আলাগিরি বিরক্ত হয়ে বলে, - আরে বাবা কানে ঘা হয়েছে বলে কি ফাঁসির আসামীর ফাঁসির দিন পেছিয়ে যায় কখনো? না ফাঁসিটা মকুব হয়ে যায়?

মোহন বললে, - তোমার দিমাগ খারাপ হয়ে গেছে দোস্ত। তুমিও বাওরা হয়ে গেছ।

মোহন সর্দার সাতদিনের সময় চেয়ে উপর মহলে একটা টেলিগ্রাম পাঠাল।

তারপর সে রাত্রেই দশ মাইল সাইকেল চালিয়ে হাজির হল সদরে! ডাক্তার সাব-এর ডেরায়!

সব কথা শুনে ডাক্তার সা'ব বললেন, তুমি যা বলছ তা হতে পারে। গোদের ওপর বিষফোড়া! এমনিতেই বেচারির দাঁত-জোড়া এমন বেকায়দায় বেড়ে গেছে যে, ও অনাহারেই আছে প্রায়....

- ডাক্তার সা'ব! ওকে যদি 'ট্র্যাঙ্কুলাইজার' বুলেট দিয়ে অজ্ঞান করে দিই, আপনি ওর কানের পাশ থেকে বুলেটটা বার করে দিতে পারবেন?

ডাক্তার সা'ব চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন - ক্ষেপেছ!

ভেটেরনারি ডাক্তার তিনি, গরু, ঘোড়া, ছাগল, কুকুর নিয়েই তাঁর দিন কাটে! চিড়িয়াখানায় অবশ্য একবার হস্তিদেহেও অপারেশন করতে হয়েছে। কিন্তু এ যে মত্ত মাতঙ্গ! অরণ্যচারী হস্তিদানব!

- আমি ক্ষেপিনি ডাক্তার সাব! গজদানবও ক্ষেপেনি। আমরা তাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছি। শুনুন। আলাগিরির টিপ অব্যর্থ! হাতির ছবি এঁকে ঠিক যেখানটায় ঢেরা-চিহ্ন দিয়ে দেবেন হুবহু সেইখানটাতেই গুলি করবে ও! হাতি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে বাধ্য! ডোজ কতটা হবে তা আপনিই বাৎলে দেবেন! গজদানব ধরাশায়ী হলে অপারেশন করতে আপনার যে দশ-পনের মিনিট লাগবে তার ভিতর আমি করাত দিয়ে ওর অন্তত একটা দাঁত কেটে ফেলব। পারব না আমরা ওকে বাঁচাতে?

ডাক্তার রমেশচন্দ্র নীরবে কী যেন ভেবে নিলেন। জীবজন্ত পশুপাখিকে তিনি সত্যিই ভালবাসেন। তারপর বললেন, - ঠিক হ্যায়।

ট্র্যাঙ্কুলাইজারের ডোজটা তিনি নিজে হাতে তৈরি করে দিলেন! ঐ প্রকাণ্ড গজদানব সহজে অজ্ঞান হবে না! আর অপারেশন শেষ হবার আগেই যদি কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হয়, -- তাহলেই চিত্তির! তাই বেশ খানদানি ডোজই দরকার!

পরদিন ওরা আবার প্রবেশ করল অভয়ারণ্যে। আজ তিনজন নয়, চারজন। ডাক্তারবাবু সবার পিছনে, বিশ হাত তফাতে। মাঝে মাঝে দূরত্বটা আবার কমিয়েও আনছেন। কে জানে, বেটা পিছন দিক থেকে যে চড়াও হবে না এমন নিশ্চয়তা নেই।

অচিরেই গজদানবের সাক্ষাৎ পাওয়া গেল! কিন্তু আজ সে একটা ফাঁকা মাঠে বিচরণ করছে। ঘাস তার হাঁটু অব্দি। লুকিয়ে লুকিয়ে তার কাছাকাছি এগিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয়। অথচ কাছে যাওয়া নিতান্ত দরকার!

কারণ আজ তো আর রাইফেল নয়, সঙ্গে রয়েছে 'ডার্ট-গান', যা থেকে ঐ ঘুম-পাড়ানিয়া ইনজেশন ছোঁড়া যাবে। ডার্ট-গান যেটা ওরা সঙ্গে করে এনেছে তার রেঞ্জ মাত্র পঁচিশ মিটার।

সমস্ত দিন প্রতীক্ষা করেও দানবটাকে অত কাছে পাওয়া গেল না!

তারপরের দুটো দিন গজদানব কোথায় যে লুকিয়ে রইল তার সন্ধানই পাওয়া গেল না!

ডাক্তার সা'ব পালাতে পারলে বাঁচেন। বলেন, - মোহন। মৃত্যু ওকে টানছে রে। না হলে এভাবে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াবে কেন? আমি যাই। চার দিন হয়ে গেল। আর তো অপেক্ষা করা চলে না।

মোহন হাত দুটি জোড় করে বললে, - আপনি তো জানেনই ডাক্তার সা'ব, আর মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা মেয়াদ আছে আমার। তার মধ্যে হল তো ভাল, না হলে হত্যাই করতে হবে ওকে।

হ্যাঁ, ডাক্তার সা'ব জানেন। ঐ আটচল্লিশ ঘন্টার হিসাবটা।

ইতিমধ্যে বনবিভাগের উপর মহল থেকে তারবার্তার জবাব এসে গেছে। যেমন করেই হোক সাত দিনের মধ্যে অভয়ারণ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনে গজদানবকে হত্যা করেও! হিসাবমত আর দুটি দিন মাত্র বাকি।

পঞ্চম দিনে আবার তার খবর পাওয়া গেল। এ কয়দিন সে অরণ্যের ও-প্রান্তে চলে গিয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে তার অভ্যস্ত এলাকায়। ওরা আবার গিয়ে আশ্রয় নিল সেই প্রকাণ্ড পাথরটার মাথায়!

কিন্তু গজদানব বোধহয় ওদের চালাকিটা সমঝে নিয়েছে। ঐ পাথরটাকে এড়িয়ে সে অন্য ঘাটে গিয়ে ঝরনা থেকে জলপান করে এল।

শেষ দিন। এবার মোহনও যেন মরিয়া হয়ে উঠল। বললে, - আমি একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতে চাই। এই ঘাটেই কোন একটা গাছের ওপর লুকিয়ে বসে থাকব।

আলাগিরি বারণ করে। বলে, - গাছগুলো আমি পরখ করে দেখেছি। সব গাছই পলকা। গজদানব সজোরে ধাক্কা মারলে মড়মড়িয়ে ভেঙে পড়তে পারে!

-পড়ে তো পড়ুক! কিন্তু ধাক্কা মারার আগেই যদি গুলি করতে পারি তবে ও তো নিজেই মড়মড়িয়ে ভেঙে পড়বে।

চন্দন বললে, - ঠিক আছে। আমিও চড়ব আর একটা ডালে। তোমার হাতে থাকবে রাইফেল, আর আমার হাতে ডার্ট-গান। ডাক্তারসা'ব বসে থাকবেন ঐ বিশাল পাথরটার মাথায়।

ডাক্তারবাবু সভয়ে বলেন, - একা?

আলাগিরি বললে, - না, আমি থাকব আপনার পাঁজর ঘেঁষে। জায়গাটা ঐ দু-নম্বর ঘাট থেকে রাইফেল রেঞ্জ-এর ভিতর। মোহনদা যদি ফস্কায় তাহলে আমি দ্বিতীয় সুযোগটা পাব।

ডাক্তারবাবু বলেন, - আর তুমিও যদি ফস্কাও?

আলাগিরি জবাব দিল না। মৃদু হাসল।

মোহন বললে, - ডাক্তারসা'ব, আলাগিরির বন্দুকের সমুখ থেকে কোন চিড়িয়া কোনদিন ভাগতে পারেনি, আর এ তো প্রকাণ্ড দেহের হাতি!

সেই মতই ব্যবস্থা হয়েছে। যে-যার জায়গায় গুছিয়ে বসেছে। চন্দন বসেছে একটা কেঁদ গাছের ডালে, মাটি থেকে বারো চোদ্দ ফুট উঁচুতে। মোহন-সর্দার একটা অর্জুনগাছে। সেটাও গজদানবের নাগালের বাইরে। বেশ কিছুটা দূরে, নিরাপদ দূরত্বে, পাথরের মাথায় বসে আছেন ডাক্তারবাবু আর আলাগিরি।

আজ মোহন আর চন্দন নেংটিসার। বাপ-বেটায় সারা গায়ে মেখেছে পাঁক-মাটি। দেহের গন্ধটা চাপা দিতে! হাতির ঘ্রাণশক্তি অতি তীব্র!

মধ্যদিনে গজরাজ এলেন। বহুদূর থেকে দেখা যাচ্ছিল তাঁকে! হেলতে-দুলতে একটু খোঁড়াতে খোঁড়াতে সে এগিয়ে আসছিল।

হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। গন্ধ শুঁকল শুঁড় আকাশে তুলে। কী আশ্চর্য। সে ওদের ছলচাতুরী বুঝে ফেলেছে। যতই গায়ে পাঁক-মাটি মাখো, ওকে ঠকাতে পারবে না! দুটো ঘাটের একটাতেও সে জলপান করতে নামল না!

অনেক দূরের একটা বন্যপথ দিয়ে সে এগিয়ে গেল ঝরনার কিনারায়। নেমে পড়ল নদীগর্ভে। এখানে জলটা একটা কুণ্ড মত তৈরি করেছে। হাঁটুজলে নেমে এল গজদানব। অবশ্য নদীতে জলও ঐ অতটাই। শুঁড়টা নামিয়ে জলপান করতে চেষ্টা করল সে! পারল না।

জোড়া-দাঁতে বাধা পাওয়ায় শুঁড়টা জলতল পর্যন্ত পৌঁছলোই না! এরপর সে বসে পড়ল জলে। এখন তার শুঁড় জলস্পর্শ করছে। শুঁড়ে করে সে জল ছিটিয়ে দিল সর্বাঙ্গে! এক ঝাঁক টীল সভয়ে উড়ে গেল আকাশে। গজদানবকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে সে মোহন সর্দারের রাইফেল রেঞ্জের ভিতর, কিন্তু চন্দনের 'ডার্ট-গান'-এর এক্তিয়ারের অনেক বাইরে।

দূরত্ব অন্তত পঁচাত্তর মিটার। মোহন আলাগিরির দিকে ফেরে। আলাগিরি নিঃশব্দে 'না'য়ের ভঙ্গিতে হাত নাড়ে, অর্থাৎ সে এখান থেকে গজদানবকে দেখতে পাচ্ছে না, মাঝখানে গাছপালার আড়াল পড়ায়।

মোহন রীতিমত উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। আজই তার শেষ দিন। রেঞ্জ-এর ভিতর পেয়েও সে যদি আজ গজদানবকে হত্যা না করে, তবে তাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে সরকারী আদেশ অমান্য করার অপরাধে। কাল পরশুর মধ্যে গজদানব যদি আবার কোন নরহত্যা করে বসে, তবে হয়ত তার সতেরো বছরের চাকরিটাই খতম হয়ে যাবে!

সে যে সুযোগ পেয়েও রাইফেল চালায়নি, সরকারি নির্দেশ পাওয়া সত্ত্বেও, এ ঘটনার দু-দুজন সাক্ষী রয়ে গেল, আলাগিরি আর ডাক্তারবাবু। এছাড়া চন্দন। সে অবশ্য বাপের বিরুদ্ধে...

কিন্তু কই? চন্দন কই?

মোহন দুরন্ত বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে, কেঁদ গাছটার সেই নির্দিষ্ট ডালে চন্দন নেই।

শিকারীর সন্ধানী চোখ! পরমুহূর্তেই তার নজর হয়, চন্দন গাছ থেকে নেমে পড়েছে! তিল-তিল করে এগিয়ে যাচ্ছে গজদানবের দিকে। যে ভঙ্গিতে টিকটিকি এগিয়ে যায় ফড়িঙের দিকে। ঝোপজঙ্গল ভেদ করে। অথচ তিলমাত্র শব্দ হচ্ছে না। নিস্তব্ধ দ্বিপ্রহরে একটানা ঘুঘুর ডাকটাই শুধু শোনা যায়। কী দুঃসাহসী ছেলেটা!

মোহন বুঝে উঠতে পারে না, কী তার কর্তব্য। সে বসে আছে অর্জুনগাছের মগডালে, সেখান থেকে গজদানবকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর স্নানরত মাতঙ্গটা আছে তার রেঞ্জের ভিতরেই। আলাগিরির মতো অব্যর্থসন্ধানী না হলেও মোহন সর্দারের টিপ্ ভালই!

অতবড় হাতিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা অল্প। কিন্তু যদি ফস্কায়? আলাগিরি জন্তুটাকে দেখতে পাচ্ছে না। মোহন লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া মানে... চন্দনের যৌবনপুষ্ট দেহটা....

ঘরওয়ালীর কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল মোহনের। চন্দনের মা কি তাহলে ওকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে? নিজের অজান্তেই মোহন নেমে পড়েছে গাছ থেকে। নিঃশব্দে।

গজদানব তো ছাড়, অগ্রবর্তী চন্দনও তা টের পায়নি। প্রায় পনের-বিশ মিটার পিছনে থেকে সে চন্দনের পথরেখা ধরেই অগ্রসর হতে থাকে। জমিতে নেমে আসার পর মোহন আর গজদানবকে দেখতে পাচ্ছে না। গাছপালায় আড়াল হয়ে গেছে।

চন্দন কিন্তু দেখতে পাচ্ছে। সে প্রায় নদীকিনারের কাছাকছি, তার সমুখে আর গাছপালার আড়াল নেই। গজাদানব এদিকে ফিরলেই চন্দনকে দেখতে পাবে।

মোহন নিঃশব্দে তার রাইফেলের সেফটি ক্যাচটা বন্ধনমুক্ত করে দিল। উঠে দাঁড়াল একটা উঁচু টিলার ওপর। - - হ্যাঁ, - এখন দুজনকেই দেখা যাচ্ছে। চন্দন আর গজদানব! রাইফেলটা উঁচু করে ধরল।

কিন্তু এ কী! তার হাত কাঁপছে কেন? মনকে শক্ত করল মোহন। সে শিকারী। সে মোহন-সর্দার। তার হাত কাঁপতে নেই।

কিন্তু কী শট নেবে? হেড-শট, না হার্ট-শট?

হৃৎপিণ্ডে গুলিবিদ্ধ হলে হাতি তৎক্ষণাৎ মরবে এমন কোন কথা নেই! নির্ভুল 'হার্ট-শট' সত্ত্বেও দেখা গেছে হাতি উঠে দাঁড়ায়, মরতে মরতেও তেড়ে আসছে।

সে তুলনায় 'হেড-শট' অনেক নিরাপদ। মস্তিষ্কে গুলিবিদ্ধ হলে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু। কিন্তু দু-একটি ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, হাতির শিরঃকঙ্কালে প্রতিহত হয়ে বুলেট বেঁকে পথে বেরিয়ে যায়!

তাহলে? কী স্থির হল? মস্তিষ্ক না হৃৎপিণ্ড?

তখনই মোহনের নজর হল চন্দনও তার ডার্ট-গানটা তুলেছে। টিপ করছে।

মোহন সিদ্ধান্তে এল। না! চন্দনকে তার সুযোগটা দিতে হবে।

চন্দন ফায়ার করল।

লেগেছে! গজদানব উঠে পড়ল জল থেকে। শত্রুকে সে দেখতে পেয়েছে! জলকাদা ভেঙে হাতিটা তীব্রবেগে ছুটে আসছে শত্রুর দিকে!

বেচারি গজদানব। সে জানে না, চন্দন তার শত্রু নয়, বন্ধু। পরম মিত্র। প্রাণদানকারী।

মোহন বন্দুকটা আবার উঁচু করে ধরে।

আঃ কী কেলেঙ্কারী। ওর সামনে চন্দন আর গজদানব একই সরলরেখায়। মানে, টিপ্ যদি ফসকায়, রাইফেলের মাছি যদি ফায়ার করার মুহূর্তে তিলমাত্র সরে যায় তাহলে গজদানবের পরিবর্তে চন্দনই লুটিয়ে পড়বে মাটিতে।

চন্দন রুদ্ধশ্বাসে পালাচ্ছে! গজদানব পশ্চাদ্ধাবন করছে তার।

কিন্তু কী মুশকিল! ওরা দুজনেই এগিয়ে আসছে মোহনের দিকে! একই সরলরেখায়!

তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড বৃংহিত-ধ্বনিতে অরণ্য কম্পিত করে গজদানব দাঁড়িয়ে পড়ল। গজদানব টলছে! তার শূন্যে উৎক্ষিপ্ত শুঁড় ধীরে, অতি ধীরে, যেন স্লো-মোশনে নেমে এল।

গজদানব লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

মোহন গুলি করল না। যদিও এখন চন্দন তার লক্ষ্যমুখে নয়।

তবু ফায়ার করল না সে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই রইল রাইফেল উদ্যত করে। হ্যাঁ, তাই হয়েছে। ট্র্যাঙ্কুলাইজার তার কাজ করছে। গজদানব অচেতন হয়েছে।

ইতিমধ্যে ডাক্তারবাবুকে নিয়ে আলাগিরিও এসে পৌঁছেছে। ঝটপট্ ডাক্তার তাঁর যন্ত্রপাতি বার করে ফেললেন। অস্ত্রোপচার করলেন কানের পাশটায়। ফিনকি দিয়ে পূঁজ-রক্ত বার হয়ে এল। সে প্রায় এক বালতি! সেই সঙ্গে সোন্না দিয়ে বার করে আনলেন একটা সিসের গোলক। বুলেট! কী সব ইনজেকশনও দিলেন।

দাঁতটা কাটতে হল না। পতনজনিত আঘাতে পাথরে লেগে ওর বাঁদিকের দাঁতটা মড়াৎ করে ভেঙে গেছে! সব কিছু সেরে ওঁরা যখন নিরাপদ দূরত্বে পালিয়ে এলেন, তখনো কুম্ভকর্ণ অঘোর ঘুমে অচেতন।

ওরা তিনজনে বেশ বড় একটা পিপুল গাছে চড়ে বসল! টেনে তুলল ডাক্তারবাবুকেও। আরও আধঘণ্টা পরে গজদানবের দেহে চাঞ্চল্য দেখা গেল। সে উঠে বসল। দাঁড়ালো। মাথাটা ডাইনে-বাঁয়ে দোলালো। কান নাড়ল। শুঁড়টা এখন মুখবিবরে অনায়াসে পৌঁছে যাচ্ছে! চারিদিকে তাকিয়ে গজদানব কী যেন খুঁজল। হঠাৎ দেখতে পেল ওদের।

ধীর গজগমনে নির্ভয়ে এগিয়ে এল কয়েক পা। শুঁড়টা আকাশপানে তুলে বৃংহিত-ধ্বনি করল একবার। এবার যেন আনন্দে! তারপর হেলতে দুলতে মিলিয়ে গেল অভয়ারণ্যে।

চন্দন বললে, - ডাক্তারসা'ব! গণেশজী কী বলল জানেন? বললে, - থ্যাঙ্কু।


ডাক্তারসা'ব বলেন, - সেটা আমিও বুঝেছি। কিন্তু 'গজদানব' আজ হঠাৎ গণেশজী হয়ে গেল কেমন করে?

মোহন সর্দার বুঝিয়ে দেয়। যে হাতির ডানদিকের দাঁতটা ভেঙে গেছে, কিন্তু বাঁ-দিকেরটা আছে তাকে বলে 'একদন্ত'। আর যার বাঁদিকেরটা খোয়া গিয়ে শুধু ডান দিকের দাঁতটা আছে তাকে বলে - গণেশজী।

আইনমাফিক মোহন সর্দার সেই খণ্ডিত গজদন্তটি সরকারী মালখানায় জমা দিয়ে এসেছিল। কিন্তু বনমন্ত্রী খুশি হয়ে তরুণ চন্দন শিকারীকে সেটা উপহার দিয়েছিলেন।

কূকাল অভয়ারণ্যে যদি কখনো বেড়াতে যান, তাহলে হেড-ওয়ার্ডেনকে বলবেন, সে দেখিয়ে দেবে চন্দন সর্দারের সেই ট্রফি! মোহন সর্দার এখন অবসর নিয়েছে। চন্দন সর্দারই কূকাল অভয়ারণ্যের হেড ওয়ার্ডেন।

গজদানব, থুড়ি, গণেশজী আজও বেঁচে আছেন!

আর আছে চন্দন-সর্দারের অফিস ঘরে সেই গজদন্তটা, গণেশজীর প্রসাদী নির্মাল্য!


ভূতায়ন - অপারেশন বেলুন ফটাস (Bhutayan - Operatio Belun Fotas)


আমরা পড়তাম কলেজিয়েট স্কুলে। সেই সময়ে সেটা ছিল নদীয়া-কৃষ্ণনগরের সবচেয়ে নামকরা স্কুল। মহাত্মা মনমোহন ঘোষের দান করা বিরাট বাড়ি। হাই স্ট্রিটের উপর মিউনিসিপ্যালিটি অফিসের উল্টো দিকে। এখন অবশ্য রাস্তাটার নাম হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোড। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি-- সেই 1940 সালের, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখনও জীবিত। তাই রাস্তার নাম তখন ছিল হাই স্ট্রিট। 
 
কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির বিরাট প্রাঙ্গণে সে আমলে বৈশাখ মাসে একটা বিখ্যাত মেলা বসত। নাম বারোদোলের মেলা। কৃষ্ণনগর মহারাজের আমন্ত্রণে ও ব্যবস্থাপনায় প্রায় এক পক্ষকালের জন্য দূর-দূর মন্দির থেকে দ্বাদশটি কৃষ্ণমূর্তিকে ঐ মেলায় নিয়ে আসা হত। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন -- মদনমোহন। ঐ দ্বাদশটি বিগ্রহকে ঘিরে বসত বিরাট একটা মেলা। মেলায় বসত অসংখ্য দোকান, -- দূর দূর পল্লী থেকে সংগৃহীত কুটিরশিল্প, -- খেলনা, খাগড়াই বাসন, শান্তিপুরের ধুতি-শাড়ি, মাদুর, পাখা, চাকি-বেলুন, বড়ি-আচার-আমসত্ত্ব, -- কী নয়! এছাড়া কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের মনমুগ্ধকর পাঁচ দশটি দোকান তো থাকতোই! তখনও কৃষ্ণনগর শহরে কোন পাকা বাইশকোপ-হল ছিল না। বাইশকোপ-হল বুঝলে তো? আমি সিনেমা হাউসের কথা বলছি! মেলাতেই তখন তাঁবু খাটিয়ে নানান জাতের সিনেমা দেখানো হত। চার্লি চ্যাপলিন, আর লরেল-হার্ডি তখন খুব জনপ্রিয়। যদিও অধিকাংশ চলচ্চিত্রই ছিল নির্বাক।

এছাড়া পড়ত সার্কাসের তাঁবু। বাঘ-সিংহ-হাতি-ঘোড়া-কুকুর আর জোকার। প্রচণ্ড ভিড় হত সার্কাসে। এ-ছাড়াও থাকত আজব তাঁবু, - - এক-মানুষের দুটো মাথা। মাকড়শা মানুষ। আরও কত কি!

জুয়ার তাঁবুও ছিল। তবে আমাদের সে-পাড়ায় যেতে দেওয়া হত না। 
 
কিছু তাঁবুকে আমরা আবার বলতাম -- এলেম তাঁবু। বন্দুক ছুঁড়ে বেলুন ফাটানো তোমরা নিশ্চয় দেখেছ। আমাদের আমলে সেটা ছিল অন্য ধরনের। এখন রথের মেলায়, গাজনের মেলায়, কলকাতা ময়দানের শিল্পমেলায়, আবার বারোয়ারি পূজা-প্যান্ডেলেও ঐ খেলার আয়োজন দেখি। একটা পিচবোর্ডে গাদাগাদি করে নানান রঙের বেলুন টাঙানো থাকে। একেবারে ঠাসাঠাসি বেলুনের ভিড়। পাঁচ হাত দূর থেকে বাচ্চারা বেলুন ফাটায়। দনাদ্দন বেলুন ফাটিয়েই তারা আনন্দ পায়। নেহাৎ ছুঁচোর মতো অন্ধ না হলে ভিড়ে-ঠাসা বেলুন মিস্ করাই কঠিন।

কিন্তু আমাদের বারোদোলের মেলায় ব্যবস্থাটা ছিল অন্যরকম। উত্তর ভারত থেকে একজন দোকানদার আসত ঐ বেলুনের দোকান নিয়ে। সেই বেলুনের দোকানে ভূতোদার কীর্তিকাহিনীটা এবার শোনাই।

ভূতোদা, আগেই বলেছি, অলরাউন্ড স্পোর্টসম্যান। এয়ারগান এও তার অদ্ভুত টিপ। দশবার ফায়ার করলে অন্তত ছয়বার বুলস-আইয়ের ভিতর হিট করবে। বাকি চারখানা কেন্দ্রের ছোট্ট চক্রের কানঘেঁষে বেরোবে। বারোদোলের মেলায় বেলুনের দোকানে ব্যবস্থাটা ছিল বিচিত্র। অসংখ্য বেলুন ঝুলছে, -- ছোট থেকে বড়, কাছে থেকে দূরে। প্রতিটি বেলুনের গায়ে একটা করে নম্বর। যে বেলুন যত কাছে, আকারে যত বড়, -- তার নম্বর তত কম। যে বেলুন যত দূরে আর মাপে যত ছোট, -- তার নম্বর তত বেশি। সব চেয়ে কম নম্বর হচ্ছে পাঁচ, আর সবচেয়ে দূরের অ্যাতোটুকু বেলুনটার নম্বর পাঁচ শো। ছররা গুলির দাম এক পয়সায় দুটো, অর্থাৎ টাকায় বত্রিশটা ছররা। পাঁচ-নম্বর বেলুনটা ফাটাতে পারলে দোকানদার দেবে পাঁচ দুগুনে দশ পয়সা, পাঁচশ নম্বর বেলুনটা ফাটাতে পারলে পাওয়া যাবে পাঁচশো দুগুনে হাজার পয়সা, অর্থাৎ দশ টাকা!


নগদে পাবে না কিন্তু! ঐ দোকানেই সাজানো আছে হরেকরকম মনোহারী সওদা। লজেন্সের কৌটো, বিস্কিটের টিন, নানান জাতের পুতুল, ক্রিকেট ব্যাট, টেনিস র‍্যাকেট, ফুটবল থেকে শুরু করে ক্যারাম বোর্ড, শৌখিন কাপডিশের সেট, মায় দেওয়াল-ঘড়ি। সে-আমলে রেস্তোরাঁয় গিয়ে পুরো আট আনার খাবার খাওয়া যেত না। সুতরাং দশ টাকায় চীনামাটির তেত্রিশ পীসের শৌখিন ডিনার সেট পাওয়া যেত।

আগেই বলেছি, ভূতোদা আমাদের লীডার। এখনও মনে আছে, ন্যাপলা যেদিন ক্লাসে বারোদোল মেলার ঐ বেলুন স্টলের গল্পটা প্রথম শোনালো, -- সেদিন ভূতোদা তো একেবারে আহ্লাদে আটখানা। বলে, চল আজ দলবেঁধে বারোদোলের মেলায় যাব। বেলুনের দোকানটা ফাঁকা করে দিয়ে আসতে হবে।

এ বিষয়ে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই। ভূদ্দার একটা নিজস্ব এয়ারগান আছে। সেটা সে তার ভোম্বল মামার কাছ থেকে উপহার পেয়েছিল, উপনয়নের দিনে। সকালে ব্যায়াম সেরে প্রতিদিন সে নিয়ম করে গুণে গুণে পঁচিশটা ফায়ার করে। ইদানীং সে এয়ারগান ছুঁড়ে বাগানের পাকা আম পাড়ে। গুলি আমের গায়ে লাগে না, -- লাগে বোঁটায়! ভূতোদার ছোট বোন নেড়ি ধামা বাড়িয়ে ধরে। আমটা টুপ করে ধামায় পড়ে। মাটিতে পড়ে না। এ হেন লক্ষ্যভেদী অর্জুন আর অনেক আশা নিয়ে আমরা সদলবলে চললাম বারোদোলের মেলায়, -- ভূদ্দা, সুখেন, নেড়া, মন্টু, ন্যাপলা আর আমি। প্রত্যেকে চার আনা করে চাঁদা দিয়েছি। আমাদের মোট পুঁজি চার-ছয় চব্বিশ আনা; অর্থাৎ দেড় টাকা। তার মানে দেড় ইনটু বত্রিশ অর্থাৎ আটচল্লিশটা ছররা। আমরা নিশ্চিত যে ভূতোদা দোকানের সব কয়টা বেলুন ফটাস্ করে দেবে। তার মানে গুদাম-সাবাড়! ফেরার পথে বোধহয় একটা ঠেলাগাড়ি ভাড়া করতে হবে!

তিন-তিনটে সাইকেলে ডবল-ক্যারি করে আমরা ছয়জন যখন বারোদোলের মেলায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা হয়-হয়। সারা মেলায় তখন পেট্রোম্যাক্স, হ্যাজাক আর ডে-লাইট জ্বালার ধুম। তখনও শহর কৃষ্ণনগরে ইলেকট্রিক লাইটের লাইন পাতা হয়নি। মেলার প্রবেশ দ্বারে সাইকেল স্ট্যান্ডে সাইকেল জমা দিয়ে আমরা পাঁচ মস্তান গুরুজীর পিছন-পিছন বেলুন-তাঁবুর দিকে এগিয়ে চলি।
 
ঢুকতে যাব, -- সামনেই অযাত্রা। ক্লাসের ফার্স্ট বয়: গজেন।


ভূতোদা ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে ওঠে। বলে, -- তুই এখানে কেন? গজেনও রুখে ওঠে, -- কেন? এমন তো কোন আইন নেই যে, সব সাবজেক্টে ফেল করতে না পারলে বারোদোলের মেলায় আসা যাবে না?

ভূতোদা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে দেখল শুধু। জবাব না দিয়ে তাঁবুর ভিতরে ঢুকে গেল। ন্যাপলা বলে, দিলি তো ভূদ্দার মেজাজটা বিগড়ে? এখন ও ক্রমাগত মিস্ করবে। মেজাজ খারাপ হলে টিপ কখনো ঠিক থাকে?

গজেন বলে, ও এমনিতেই মিস্ করতো। এখন বরং আমার ঘাড়ে দোষ চাপাবার একটা অজুহাত পাবে। সুখেন বলে, যাগগে মরুগগে ওসব ছেঁদো কথা! গজেন, তুই কি আমাদের দলে আসবি? চার-আনা চাঁদা দিয়ে? গজেন জানতে চায়, কিসের চাঁদা? ন্যাপলা আর ন্যাড়া ওকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়, -- এই বেলুন-তাঁবুর যাবতীয় সওদা বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য আমরা অপারেশন বেলুন-ফটাস্ স্কীম করেছি। শুনে গজেন তো হেসেই বাঁচে না! 
 
ওর সঙ্গে তর্কাতর্কি না করে আমরা পাঁচজন তাঁবুর ভিতর ঢুকে যাই। ভূতোদা ততক্ষণে লাইনে দাঁড়িয়েছে। 
 
বেলুন-তাঁবুতে লক্ষ্যভেদী অর্জুনদের ভিড়। কিউ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছররার টিকিট কিনতে হয়। ভূতোদা লোকটাকে যখন দেড় টাকা দিতে চাইল তখন লোকটা রাজি হল না। দেহাতি হিন্দির সঙ্গে বাঙলা মিশিয়ে বলল – বাবুজি, এক সঙ্গে এক রূপিয়ার য্যাদা টিকস্ হামি দিতে পারি না। সোচিয়ে, সব কোইকো তো খুস্ করনা পড়েগা না? 
 
যুক্তিপূর্ণ কথা। ভূতোদার পিছনে যারা কিউতে দাঁড়িয়েছে তারা না হলে কী করবে? ফলে একটাকায় বত্রিশটা ছররা কিনে ভূতোদা বন্দুকটা নিয়ে দাঁড়ালো। আমাদের বললে, কী কী নিয়ে যাব পছন্দ করেছিস্? নেড়া বলল, প্রথম বত্রিশটায় তোমার স্কোর কত হয় দেখি। 
 
-- তবে তাই দ্যাখ। প্রথমে ফার্স্ট সেঞ্চুরিটা তো করি। তারপর যে কাণ্ড হল,
 
-- কী বলব, -- লিখতে গিয়ে এখনো আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। ঘটনাটা অবিশ্বাস্য! ভূতোদার নয়, ভূতের ভেলকি! 
 
ভূতোদা দনাদ্দন ফায়ার করছে আর ধড়াধ্বড় মিস্ করছে। আমাদের প্রত্যাশায় যে বল ওভার বাউন্ডারী হবার কথা তা একের পর এক জমছে উইকেট-কীপারের হাতে। প্রথম দশটা ফায়ারে স্কোর-শূন্য। বিশ্বাস হয়? একটা বেলুনও ফাটেনি, দশটা ফায়ারে। এমন এক বন্দুকবাজের হাতে যাকে স্বচক্ষে দেখেছি আমের বোঁটায় ফায়ার করে আম পেড়ে নামাতে! 
 
অবশ্য একটা কারণও যে না ছিল তা নয়। না, একটা নয়, দুটো হেতু। প্রথমত ভূতোদার লক্ষ্য দূরের কোনও ছোট্ট বেলুন। যার মার্কা তিনশ থেকে পাঁচশ। কাছাকাছির বেলুন সে টিপই করছে না। দ্বিতীয় কথা, -- ভূতোদা একটা করে মিস্ করে আর কে যেন পিছনে ভিড়ের মাঝখানে খামোখা গলা খাঁকাড়ি দেয়। কে আবার? ঐ জিবেগজাটা। আমি বলি, মারি তো হাতি, লুঠি তো ভাণ্ডারের আশা ছেড়ে দাও, ভূদ্দা। একটা বিশ-পঞ্চাশী বেলুন ফাটিয়ে অন্তত বউনিটা কর দিকিন? অন্তত একটা ফটাস তো কানে শুনি! 
 
কে কার কথা শোনে? আর ভূতোদা চিরটা কাল এক নম্বর গোঁয়াড়। সে বাকি বাইশটা ফায়ার করল একটা পাঁচশো নম্বর লেখা বেলুনে। সব কটাই ফস্কালো! বত্রিশটা ফায়ার করে ওর স্কোর: ---- শূন্য। 
 
নেড়া বলে, কী হল বলতো ভুদ্দা? দোকানি কি কিছু তুকতাক করেছে? ভূতোদা বলল, তুকতাকে আমি বিশ্বাস করি না। আসল ব্যাপার হল – মাছি
 
 -- মাছি! মানে? 
 
ভূতোদা আমাদের জবাব দিল না। সোজা গিয়ে চ্যালেঞ্জ করল দোকানিকে, -- আপকে মক্ষিকামে গলতি হ্যায়। দোকানি তো আকাশ থেকে পড়ে! আমরাও। ভূতোদা তখন এয়ারগান - এর ফোরসাইট বা মাছিটাকে দেখায়। যেটা দেখে বন্দুকধারী টিপ্ করে। বলে, আপকে বন্দুকমে য়ো নিশানা গলতি হ্যায়। 
 
দোকানি তো হেসেই বাঁচে না। বলে, বাবুজী! বে-ফাজুল দিমাগ খারাপ করবেন না। মেরি বন্দুক মে কোই গলতি নহী। বলকি আপহি কা নজর ঠিক নেহী হায়, এলেম নেহী হায়, মায় ক্যা করু? 
 
ভূতোদা পকেট থেকে একটা সিকি বার করে বললে, য়ো চৌ-আনি সে আটটা ছররা খরিদিয়ে, ঔর হমকো দেখাইয়ে কি আপকা বন্দুককী নিশানা ঠিক হ্যায়। 
 
দোকানি তাতে রাজী নয়। তার যুক্তিটাও ফেলে দেবার নয়। সে হিন্দি মেশানো বাঙলায় বলে, আমি তো বলিনি যে, আমি একজন এলেমদার বন্দুকবাজ। আমি বুড়ো মানুষ। চোখে ছানি পড়েছে। আমি তো সেরেফ দোকানদার। আমি কেন বন্দুক ছুঁড়তে যাব? 
 
দোকানে আর যারা উপস্থিত ছিল তারাও দোকানদারের পক্ষ নিল। আসলে যারা লাইনে দাঁড়িয়ে ছররা কিনেছে তারা এই তর্কাতর্কিতে বিরক্ত। তারা এবার বন্দুক ছুঁড়তে চাইছে। ভূতোদা বন্দুকটা ফেরত দিয়ে দিল। 
 
ওমা, এ কী! ভূতোদার পরেই লাইনে ছিল জিবেগজা ওরফে গজেন। সে বন্দুকটা নিয়ে তাক করে ছুঁড়ল। কী দারুন বরাত! প্রথম ফায়ারেই একটা বিশ নম্বরী বেলুন ফাটলো, -- ফটাস্। জিবেগজা ভূতোদার দিকে তাকিয়ে হাসল। দোকানি বললে, দেখিয়ে বাবুজী। যিসকা নিশানা ঠিক নহী হায়..... ভূতোদা আমাদের বললে, চলে আয় তোরা। লোকটা ফোর-টোয়েন্টি। ওকে এভাবে কব্জা করা যাবে না। 
 
আমি বলি, তা পালিয়ে গেলে ওকে কীভাবে কব্জা করা যাবে? ততক্ষণে জিবেগজা দু নম্বর বেলুন ফাটিয়েছে-এটা দশ দুকুনে বিশ পয়সা। দোকানি বললে, দেখিয়ে, দেখিয়ে বাবুজী। ভূতোদা বললে, তোবা আসবি? না আমি একাই যাব? 
 
গজেন আমাকে বলে, যা যা ভূতো-জ্যেঠার পিছু পিছু যা। নইলে ভূতোজ্যেঠা ক্ষেপে যাবে। 
 
কোথায় চলেছে ভূতোদা? জানি না। তবে গুরুবাক্য বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে হয়। আমরা পাঁচজনও ছুটতে থাকি ওর পিছু পিছু। ভূতোদা এসে থামল একটা টালিছাওয়া পাকাঘরের সামনে। বাইরে লেখা আছে -- ম্যানেজারের অফিস। 
 
এতবড় মেলায় রাজ সরকারের তরফে একজন ম্যানেজারবাবু আছেন। প্রৌঢ় মানুষ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। সন্ধ্যা থেকেই এসে বসেন অফিসে। রাত দশটা পর্যন্ত থাকেন। ওদিকে সদর থানার দারোগাবাবুও সন্ধ্যাবেলা সপরিবারে এসে হাজির হন। তাঁর গিন্নি কাচ্চাবাচ্চাদের নিয়ে মেলায় ঘোরেন, আর কর্তামশাই অফিসে বসে শান্তিরক্ষার অছিলায় ম্যানেজারবাবুর আপ্যায়নের অত্যাচার সহ্য করেন। কোনওদিন শরবৎ, কোনদিন বা চা-সিঙাড়া। এছাড়া থাকে সন্দেশ, সরপুরিয়া, সরভাজা ইত্যাদি। 
 
আমরা আধডজন মস্তান যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছালাম তখন ঘটনাচক্রে দারোগাবাবু উপস্থিত। ভূতোদা তার অভিযোগটা ব্যক্ত করল। মেলার একত্রিশ নম্বর তাঁবুতে যে লোকটা বেলুন ফাটানোর ব্যবসা খুলেছে সে লোকটা জোচ্চোর। ম্যানেজারবাবু জানতে চান, কেন বাবা? কী করে বুঝলে? 
 
ভূতোদা তার অভিজ্ঞতা বিস্তারিত জানালো। বলল, তার এয়ারগানের টিপ্ বেশ ভালই। বলে-বলে সে বুলস্ আই হিট করে। অথচ এখানে বত্রিশটা ফায়ার করে একটা বেলুনও ফাটাতে পারেনি। 
 
দারোগাবাবু জানতে চান, তুমি কলেজিয়েট স্কুলের ফুটবল-টিমে গোলকিপিং কর, তাই না? ভূতোদা বলে, -- তা করি। আবার শীতকালে উইকেট-কীপিংও করি। কিন্তু তার সঙ্গে ঐ জোচ্চোরটার কী সম্পর্ক? 
 
ম্যানেজারবাবু বলেন, আহাহা, অহেতুক লোকটাকে জোচ্চোর ভাবছ কেন? ও যে জুয়াচুরি করছে তা তুমি বুঝলে কী করে? 
 
-- ঐ তো বললাম। বত্রিশটা ফায়ার করে একটা বেলুনও ফাটাতে না পারায়। ও নিজের বন্দুকের ঐ নিশানাটা, মানে মাছিটা হাতুড়ি মেরে সরিয়ে দিয়েছে নিশ্চয়....। ন্যাড়া ফস্ করে বলে বসে, কিন্তু জিবেগজাটা তো পরপর দুটো বেলুন ফাটালো? 
 
দারোগাবাবু জানতে চান, জিবেগজা কে? সে কখন বেলুন ফাটালো? আমিই ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম। জিবেগজা কে, ও কখন বেলুন ফাটিয়েছে। 
 
 ম্যানেজারবাবু বলেন, তাহলে তো ল্যাটা ঢুকেই গেল। দোকানি যদি বন্দুকের নিশানা নড়িয়ে দিয়ে থাকে তাহলে সেই খাজা-গজা কী করে বেলুন ফাটায়? ন্যাড়া বলে, খাজা-গজা নয়, জিবেগজা! 
 
-- ঐ হল। একই কথা। 
 
দারোগাবাবু বললেন, না, হল না। আমাকে ব্যাপারটা সমঝে নিতে দিন। সমস্ত কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনে দারোগাবাবু ভূতোদাকে বললেন, তুমি ঠিকই ধরেছ হে ছোকরা। ও লোকটা বন্দুকের নিশানা নড়িয়ে দিয়েছে। শোন, তুমি সাইকেলে চেপে নিজের এয়ারগান আর এক মুঠো ছররা নিয়ে এস তো ভাই। আমি ব্যাপারটা তদন্ত করে দেখতে চাই। কতক্ষণের মধ্যে ফিরে আসতে পারবে? 
 
-আঠারো থেকে বিশ মিনিট। 
 
-না। আধঘণ্টার আগে ফিরে এলে হবে না। পথে কোনও অ্যাকসিডেন্ট বাধিও না। ধীরে সুস্থে নিজের এয়ারগানটা নিয়ে এস তো দেখি? 
 
ভূতোদা ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। 
 
ম্যানেজারবাবু বললেন, কিন্তু একটা কথা, দারোগাবাবু। লোকটা যদি ওর বন্দুকের মাছি সরিয়ে-নড়িয়ে দিয়ে থাকে তাহলে ঐ খাজা-গজা না কী-যেন নাম, সে ছোকরা কী করে বেলুন ফাটালো? 
 
দারোগা বলেন, এটা স্রেফ অঙ্কের হিসেব। ধরুন, ও লোকটা নিশানা ত্রিশ মিনিট বাঁকিয়ে দিয়েছে- 
 
ম্যানেজারবাবু বলেন, সে আবার কী কথা? ওটা কি ঘড়ি? বন্দুকের নিশানায় আবার ত্রিশ মিনিট কাকে বলে? দারোগাবাবু আমাদের দিকে ফিরে বলেন, তোমরা কেউ কিছু বুঝেছ? 
 
আমি বলি, আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি হাফ-এ-ডিগ্রির কথা বলছেন। কৌণিক মাপ, -- মিনিটে। ষাট মিনিটে এক ডিগ্রি। - কারেক্ট। দিন তো ম্যানেজারবাবু প্যাড আর পেন্সিলটা। 
 
দারোগাবাবু একটা নকশা ছকে বললেন, মনে কর এই সরলরেখাটা হচ্ছে সঠিক পথ, -- নিশানা পালটানো না হলে যে পথে গুলি ছুটে যাবার কথা। আর এটা হচ্ছে ভ্রান্ত পথ, -- যে পথে এখন গুলিটা যাচ্ছে, মাছিটাকে সরিয়ে-নড়িয়ে দেওয়ায়। তাহলে দেখ, ভুল পথে গেলেও দশ ফুট দূরের বেলুনটা বিদ্ধ হচ্ছে। বেলুনের কেন্দ্রবিন্দুতে গুলিটা বিদ্ধ হচ্ছে না বটে, হচ্ছে এক পাশে। তবু তা ফাটবে। কিন্তু ভূতনাথ দূরের বেলুনকে বারে বারে লক্ষ্য হিসাবে স্থির করেছে। তাই বারেবারেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। কারণ দশ ফুট দূরে গুলিটা মাত্র এক ইঞ্চি পরিমাণ লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও, ত্রিশ ফুট দূরে সেটা হয়ে গেছে তিন ইঞ্চি। যেহেতু দূরস্থিত বেলুনটা আকারে ছোট তাই লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। 
 
আমরা সবাই অঙ্কের ব্যাপারটা ভালো করে সমঝে নিতে নিতেই ভূতোদা তার নিজস্ব এয়ারগান সমেত ফিরে এল। তার পকেট-বোঝাই ছররা। 
 
দারোগাবাবু বললেন, চল তোমরা সবাই। ম্যানেজারবাবু, -- আপনিও আসুন। ম্যানেজারবাবু কাঁইকুই করেন, আবার এই বুড়ো মানুষটাকে ধরে টানাটানি করছেন কেন? 
 
-- প্রয়োজন আছে বলেই করছি। কথায় বলে, বিবাদটা থানা-আদালতে গড়িয়েছে। তা থানাতে তো পৌঁছেই গেছে। আদালতেও গড়াতে পারে। আপনাকে কিছু করতে হবে না। আপনি শুধু সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত থাকবেন। 
 
আমরা সদলবলে ঢুকতেই দোকানি লোকটা উঠে দাঁড়ালো। সেলাম বাজিয়ে বালিয়া জেলার দেহাতি ভাষায় বলল, আঁয়ি, আঁয়ি, দারোগাবাবা -- সাহেব, ইধর পাধারিয়ে। কুছ ঠান্ডাই বোলাই? 
 
দারোগাবাবু বিশুদ্ধ বঙ্গভাষায় বললেন, হ্যাঁ, ঠাণ্ডা করে দেবার জন্যেই এসেছি। শোন হে, এই বাবুকে বত্রিশটা গুলি ছুঁড়তে দিতে হবে, -- ওর নিজের বন্দুকে, নিজের গুলি। -- এই ধর তোমার আট-আনা। 
 
বিনয়ের অবতার দোকানি রুখে ওঠে, কেঁও সাব? ক্যা মেরি বন্দুকমে কুছ গলতি হৈ? 
 
-- হৈ কি নেহী হৈ, সেটাই যাচৈ করতে চৈ, বাবা। 
 
যার হাতে বন্দুকটা ছিল, উঠতি জোয়ান একটি তরুণ, সে বললে, আপনি লাইনে দাঁড়ান। আমার পর আপনার চান্স আসবে। দারোগাবাবু বললেন, আপনি আমাকে চেনেন না, তাই ওকথা বললেন। আমি সদর থানার দারোগা। দোকানির বন্দুকের নিশানা ঠিক আছে কি না জনস্বার্থে সেটা যাচাই করতে চাই। আপনি সরে দাঁড়ান। 
 
 ভূতোদা এগিয়ে এল। এখন রঙ্গমঞ্চে সেই হিরো। বললে, নরেন, দ্যাখ তো ছোট-বড় হাতি কটা আছে, এ জঙ্গলে ....... 
 
-- হাতি? মানে? 
 
-- তুই বলেছিলি না যে মারি তো হাতি, লুটি তো ভাণ্ডার করতে? এখন আমি শুধু হাতিই মারব। জিবেগজার মতো ছুঁচো মেরে হাতে গন্ধ করব না। বেশি দামের বেলুন কটা আছে? 
 
আমি ওকে দেখিয়ে দিলাম, পাঁচশ মার্কা বেলুন আছে মাত্র একটি, সাড়ে-চারশ দুটি, আর চার শ তিনটে। ভুতোদা বললে, বাস, ব্যস, অত আমার মনে থাকবে না। দাঁড়া আগে বড় হাতির পেটটা ফটাস্ করি – 
 
টিপ করে প্রথম ফায়ারেই সবচেয়ে দূরের সবচেয়ে ছোট্ট বেলুনটা: ফটাস্। তার নম্বর পাঁচশো। আমরা পাঁচ বন্ধু চিৎকার করে উঠি, -- হুররে। 
 
ভূদ্দা বললে, গোল করিস না। কনসেনট্রেশান নষ্ট হয়ে যাবে। সে আবার দ্রাম করে ফায়ার করল। সেকেণ্ড উইকেট ডাউন! সাড়ে চারশ মার্কা প্রথম বেলুনটা। দোকানির চোয়ালের নিম্নাংশটা ঝুলে পড়ল। 
 
প্রথম দশটা ফায়ারে ওর স্কোর চার হাজারের কাছাকাছি। চার হাজার পয়েন্ট মানে একশ পঁচিশ টাকা। যে বাজারে ল্যাংড়া আমের দর তিন টাকা শ। প্রথম শটেই তো পাঁচ শ ফেটেছে। সাড়ে চার আর চার শ নম্বরী বেলুন সব খতম। এবার ও ফাটাচ্ছে সাড়ে তিনশ মার্কা বেলুন। 
 
দোকানি কাটা কলাগাছের মতো ধ্রাশ করে পড়ে গেল দারোগাবাবুর ঠ্যাং জোড়ার উপর। জান বাঁচাইয়ে দারোগা বাবা। মর যাউঙ্গা। বিলকুল মর যাউঙ্গা। বালবাচ্ছা লেকর ম্যয় ভি ফটাস হো যাউঙ্গা। 
 
ভূতোদা আমাকে বললে, তুই বাইরে গিয়ে একটা ঠেলার ইন্তেজাম কর তো নরেন। বত্রিশটা ফায়ারের পর এ তাঁবুতে ঐ বুড়োটা ছাড়া আর কিছু থাকবে না। গুদাম সাবাড় করে ছাড়ব আমি। 
 
ন্যাপলা বলে, ঠ্যালার কী দরকার ভূতোদা? এখানেই নিলামে সব ঝেড়ে দিয়ে খালি হাত পায়ে, -- কিন্তু ভর্তি পকেটে বাড়ি ফিরব। না হলে বাড়িতে কৈফিয়ৎ দিতে দিতে জান নিকলে যাবে।
 
 নেড়া বললে, ন্যায্য কথা। প্রমাণ করতে পারব না তো যে, এ গুলো চোরাই বা লুঠের মাল নয়। দারোগাবাবু বলেন, তোমার তো দারুণ টিপ হে ভূতনাথ। শুটিং কম্পিটিশনে নাম দাও না কেন? 
 
ভূদ্দা বলে, এ বছর দেব! আপাতত এর গুদামটা সাবাড় করতে দিন। 
 
কিন্তু দোকানি ওর বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়ায়। আর গুলি ছুঁড়তে দেবে না সে। তাহলে বালবাচ্চা নিয়ে সে মরেই যাবে। দারোগাবাবুকেই সে সালিশ মানে। 
 
দারোগাবাবু বলেন, অল রাইট। আমি বিচার করে দেব। কিন্তু আমার বিচার তোমরা দুজন এক কথায় মেনে নেবে তো? পরে আপত্তি করবে না? 
 
দোকানি আর ভূদ্দা দুজনেই রাজি হল। ভূদ্দা প্রথমটা গাঁইগুই করছিল; কিন্তু শেষমেশ আমার পরামর্শ শুনল। ম্যানেজারবাবুও অনুরোধ করলেন ওকে, এই সালিশী মেনে নিতে। 
 
দারোগাবাবু দোকানিকে বললেন, প্রথম কথা, তোমার বন্দুকের নিশানা ঠিক নেই। তুমি জুয়াচুরি করছিলে এটা প্রমাণ হয়েছে। তুমি অপরাধ স্বীকার করছ? 
 
দোকানী গরুড়পক্ষীর ভঙ্গিতে জোড়হস্তে বললে, হুজুর মাইবাপ। 
 
-- সেটা কোন কথা নয়, আমি তোমার মা-বাপ, কি ঠাকুর্দা, সেটা কথা নয়, কথা হচ্ছে তুমি অন্যায় করেছ! কবুল খাচ্ছ? 
 
-- জো হুকুম, হুজুর! 
 
-- তোমার তাঁবু আমি সীল করে দিয়ে যাচ্ছি। তুমি তোমার বন্দুকটা নিয়ে কলকাতা চলে যাও। মেরামত করিয়ে নিয়ে এসে আমাকে খবর দেবে। এই ভূতনাথবাবু সেটা চেক্ করে পাস করে দিলে আবার দোকান চালু করতে পারবে। সমঝা? 
 
-- জী হুজুর। 
 
-- আর ভূতনাথ ভাই! তোমার উপর তিনটে আদেশ। প্রথম কথা, তুমি ইচ্ছেমতো তোমার পাঁচ বন্ধুর জন্য পাঁচটা স্মৃতিচিহ্ন, যে পাঁচটা তোমার পছন্দ, উঠিয়ে নাও। আর নিজের জন্য একটা। কেমন রাজি? 
 
ভূদ্দা বললে, না, স্যার। আমাকে আরও দুটো জিনিস দিতে হবে। ঐ ছয়টার উপর। ঐ মোরাদাবাদী ফুলদানিটা, -- ওটা আমি উপহার দেব ম্যানেজারবাবুকে, আর দেওয়াল ঘড়িটা। সেটা আপনাকে। 
 
দারোগাবাবু বিব্রত হয়ে বলেন, না, না। আমি বিচারক। আমার উপহার নেওয়া ভাল দেখায় না। ম্যানেজারবাবু বলেন, না, স্যার। আপনি বিচারক নন, আর্বিট্রেটার, মানে সালিশী। বিবদমান দুই পক্ষের ঝগড়া-কাজিয়া যিনি মিটিয়ে দেন তাঁর পক্ষে ফিজ নেওয়া বে-আইনী নয়। দোকানি পাদপূরণ করে, দেওয়াল ঘড়ি আপকো মেহেরবানী করকে লেনেই পড়েগা হুজুর। 
 
দারোগাবাবু বললেন, ঠিক আছে, আপনারা পাঁচজনে যখন এত পীড়াপীড়ি করছেন, তখন ঘড়িটা না হয় স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে আমি নিয়েই যাব। কিন্তু তোমার আরও দুটো কাজ আছে ভূতনাথ। 
 
-- বলুন স্যার। 
 
-- প্রথম কথা, এই দোকানদার কলকাতা থেকে বন্দুকের নিশানা ঠিক করিয়ে আনার পর তুমি তা পরীক্ষা করে সার্টিফাই করবে, 
 
-- করব। 
 
-- সেকেন্ডলি, আমি এ দোকানের সীল খুলে দিলে মেলা শেষ হওয়া তক্ তুমি এ তাঁবুতে এসে আর বেলুন ফাটাবে না। 
 
ভূতোদা গুম হয়ে বলে, এটা কেমন বিচার স্যার? কোন্ অপরাধে আমার এ শাস্তি? 
 
-- না, ভূতনাথ ভাই। কোন অপরাধের জন্য নয়। এ লোকটা অন্যায় করেছে। তার সাজা আমি ওকে দিচ্ছি। এ কয়দিনে ও যত মুনাফা করেছে তা আজকে দশ মিনিটে কর্পূরের মতো হাওয়ায় উবে গেল। লোকটার এটাই উপজীবিকা। আমি তো এক অপরাধে ওকে দু-বার শাস্তি দিতে পারি না। তুমি তোমার দুর্দান্ত টিপের জন্য পুরস্কারও পেয়ে যাচ্ছ। তোমারও উচিত লোকটাকে সৎ পথে উপার্জন করতে সাহায্য করা। ক্ষমা করা। তাই না। 
 
ভূদ্দা এক কথায় মেনে নিল। বললে, ঠিক আছে, স্যার। কিন্তু পরের বছর ও যদি বারোদোলের মেলায় আবার আসে? 
 
-- পরের বছরের হিসাব পরের বছর হবে। আমি তো এখানে পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট করতে বসিনি। এ বছর তুমি এ তাঁবুতে এসে আর বন্দুক চালাবে না। বাকি কয়দিনে ওকে লোকসান যতটা সম্ভব পুষিয়ে নিতে দাও। 
 
ভূদ্দা বললে, -- অল রাইট, স্যার। মেনে নিলাম আপনার রায়। তাই হবে। 
 
-- গুড। এবার বল, তুমি দোকান থেকে কী কী উঠিয়ে নেবে? 
 
ভূদ্দা আমাদের পাঁচ বন্ধুর জন্য একটাই স্মৃতিচিহ্ন তুলে নিল, -- চ্যাম্পিয়ান সাইজ একটা ক্যারাম বোর্ড। আমাদের পাঁচজনের যৌথ উপহার। ম্যানেজারবাবুর জন্যে সে তুলে নিল একটা মোরাদাবাদী কাজ করা ফুলদানি। আর দারোগাবাবুর জন্য দেওয়াল ঘড়িটা। 
 
-- আর তোমার নিজের জন্য? 
 
-- ঐ ডন ব্র্যাডমানের সই ছাপা উইলো-কাঠের ক্রিকেট ব্যাটটা, স্যার। 
 
দোকানি খুশি হয়ে বললে, -- বহুৎ খুব। লে যাইয়ে আর্জান সরদার! আপকা ইনাম। 
 
ভূদ্দা বলে, আর্জান সরদার মানে? 
 
দারোগাবাবু বুঝিয়ে দেন, ও বলছে অর্জুনের কথা। দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় যে অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে তাঁর অব্যর্থ টিপের নমুনা দেখিয়েছিলেন। অর্জুনের নামই অপভ্রংশে, - আর্জান! সে হিসাবে ঐ ব্যাটটার নাম, --- দ্রৌপদী।
 
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এই গল্পটি শুনতে হলে নিচের লিংকে ক্লিক করুন: 

বেলুন ফটাস্। নারায়ণ সান্যাল। মজার গল্প। গল্প পাঠে : অনুব্রতা Narayan Sanyal. Comedy Story Bhutayan

ভূতায়ন - অপারেশন শীল্ড ফাইনাল (Bhutayan - Operational Shield Final)

 
একমাত্র লেখাপড়া ছাড়া আর সব বিষয়েই ছেলেটার অদ্ভুত প্রতিভা। স্পোর্টসের দিনে এক গাদা মেডেল নিয়ে বাড়ি যায়। সারা বছর খেলার মাঠে সে হাজির। ঝড়-ঝঞ্ঝা বজ্রপাত, একদিনও কামাই নেই। ছোট ছেলেদের অতি যত্ন নিয়ে শেখাত খেলা। তাছাড়া খুব ভাল ম্যাজিক দেখাতে পারত সে। প্রতি বছর আমাদের প্রাইজের দিন ভূতোদা ম্যাজিকের খেলা দেখাত। মফঃস্বল শহরের এই সরকারী স্কুলের প্রাইজ উৎসবে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সকলেই আসতেন। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, কলেজের প্রিন্সিপাল। সকলের চোখের সামনে দিয়ে সে রুমালকে বানাতো পায়রা, ব্লটিং কাগজকে দশটাকার নোট। যেটাতে মন দেবে তার চরম করে ছাড়বে। এমনি ছিল ওর অধ্যাবসায়।

ওর কাকা ছিলেন স্থানীয় ওভারসিয়ার-স্কুলের ড্রইং টিচার। তিনি বলতেন, - ওর মাথা নাকি খুব সাফ। মন দিয়ে পড়াশুনা করলে ভূদ্দা নাকি অনায়াসে এঞ্জিনীয়ারিঙেও পাস করত। শোনা যায় হেডমাস্টার মশাই ওকে ডেকে একবার বলেছিলেন, - 'বাবা ভূতনাথ, মন দিয়ে পড়লে তুমি পাস করতে পার না, এটা তো আমার বিশ্বাস হয় না বাবা।'

ঘাড় চুলকে লাজুক লাজুক মুখে ভূতোদা উত্তরে বলেছিল, - 'ঐ জন্যই তো আমি মন দিয়ে পড়ি না, স্যার।' দূরন্ত বিস্ময়ে হেডমাস্টার মশাই বলেছিলেন, - 'কেন বাবা? তাহলে কি হবে?'

-'পড়লেই আমি পাস করে যাব। আর আমাদের স্কুল টীমটা একেবারে কানা হয়ে যাবে। স্যার গুরুদাস চ্যালেঞ্জ শীল্ডটা হিপ্-হিপ-হুররে করে নিয়ে যাবে ঐ সি. এম স্কুল।' গম্ভীর-প্রকৃতি হেডমাস্টার মশাই নাকি হেসে ফেলেছিলেন ওর কথা শুনে।

কিন্তু আমরা হাসিনি। হাসির কথা নয় বলেই হাসিনি। স্যার গুরুদাস চ্যালেঞ্জ শীল্ড আমরা পর পর চার বছর ঘরে আনছি। প্রতিবারই ক্রিশ্চিয়ান মিশনারী স্কুল, বা সংক্ষেপে সি.এম.এস হয় রানার্স-আপ। কতবার কত ভাবে যে ভূতোদা আমাদের স্কুলের সম্মান রক্ষা করেছে তা আর কহতব্য নয়। এককালে স্যার আশুতোষ বলতে নাকি বোঝাত বিশ্ববিদ্যালয়কে, আর বিশ্ববিদ্যালয় বলতে বোঝাত স্যার আশুতোষকে। আশ-পাশের পাঁচটা স্কুল টীমও তেমনি কলেজিয়েট স্কুল বলতে বোঝে ভূতনাথ ভট্টাচার্যকে আর ভূতনাথ বলতে বোঝে আমাদের স্কুলের পেনাল্টি ঈটার গোলী, উইকেটকীপার-কাম-সেঞ্চুরি ব্যাট এবং নির্ভুল স্ম্যাশার নেটম্যানকে।

এ বছরও শীল্ড ফাইনালে যথারীতি ওদিক থেকে উঠেছে সি.এম স্কুল আর এদিক থেকে উঠেছেন আমাদের আদি-অকৃত্রিম ভূতোদা, আরও দশটা ছানাপোনা নিয়ে।

ফাইনালের খেলাটা যাতে জমজমাট হয় তাই কর্তৃপক্ষ আমাদের এই দুটি সেরা স্কুলের টীমকে দু-দিকে গ্রুপে রেখে নকআউট প্রোগ্রাম ছকতেন। এবার ফাইনাল খেলা প্রথম দিন গোললেস্ ড্র হয়েছে। সেদিন আমি মাঠে যাইনি। এই অপরাধে ভূতোদা প্রথমেই তো আমাকে ন-ভূতো ন-ভবিষ্যতি ধমকালো। তাই দ্বিতীয় দিন ঠিক সময়ের আগেই গিয়ে মাঠে হাজিরা দিলাম।

মাঠের একপাশে সামিয়ানা খাটানো। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব এসেছেন তাঁর মেমসাহেব স্ত্রীকে নিয়ে। স্যার গুরুদাস চ্যালেঞ্জ শীল্ড আর রূপার কাপগুলো চকচক করছে পড়ন্ত আলোয়। আগের দিন গোলশূন্য ড্র হয়েছে। বাড়তি সময় খেলিয়েও কোন হিল্লে হয়নি। 'সাডেন ডেথ'-আইন তখনো চালু হয়নি। ফলে এই রি-প্লের আয়োজন। আজ তাই উৎসাহ উদ্দীপনা আরও বেশি।

এ বছর অবশ্য সি.এম. স্কুলের জিতবার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের গত বছরের ফুল টীমের চার চারটে ছেলে ম্যাট্রিক পাস করে বেরিয়ে গেছে। অথচ ওদের গত বছরের ফুল-টীমটাই এসেছে দেখছি। একটা বছরে ছেলেগুলো মাথায় বেড়েছে, গায়ে-গতরেও মজবুত হয়েছে আরও। তাছাড়া বোঝাপড়াটা আরও বেশি হয়েছে, হাফ-লাইনের সঙ্গে উইংসের, উইংস-এর সঙ্গে ইনের, ইনের সঙ্গে স্কোরারের। ছোট-ছোট পাসে খেলতে শিখেছে ওরা। বেশিদিন এক টীমে খেললে যা হয়। শুনলাম আগের দিন ড্র হয়েছে বটে, কিন্তু সারাক্ষণই ওরা চেপে রেখেছিল। ন্যাপলা খেলা দেখেছিল, বললে, - 'হাফমাঠের ওপাশে বল গেছে কিনা সন্দেহ। ক্রমাগত আমাদের গোলে বল কিক করেছে ওরা। ভূতোদা অন্তত আধ ডজন একেবারে অব্যর্থ গোল বাঁচিয়েছে, তার ভিতর একটা পেনাল্টি।' ন্যাপলার মতে অন্তত ছয় গোল খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

আগের দিন জয়ের নিশ্চিত সম্ভাবনা দেখে গেছে ওরা। আজ তাই পুরোদস্তুর তৈরি হয়ে এসেছে।

খেলা শুরু হবার আগে ভূতোদা আমার কাছে এসে কানে কানে বললে, -'কান্ডটা দেখেছিস নরেন, ওরা লরি ভাড়া করে এনেছে শীল্ড নিয়ে যাবে বলে। দ্যাখ, চেয়ে দ্যাখ, ওদের সারা স্কুলটাই এসেছে মাঠে। মাস্টার মশাইরা সবাই এসেছেন, মায় বেয়ারা-দপ্তরি-দারোয়ান ইস্তক। আর আমাদের স্কুলের? গুনে দ্যাখ, বিশটা বাছুরও আসেনি।'
 
রাগ তো হবারই কথা। নেপাল, নেড়া, ক্যাবলা, গজেন, গোবিন্দ আর আমি। ক্লাস টেনের বেয়াল্লিশটা ছেলের মধ্যে কুল্লে এই পঞ্চপাণ্ডব হাজির। অক্ষৌহিণীর বাদ বাকি বেপাত্তা। অন্যান্য ক্লাসেরও ঐ একই হাল। গোটা স্কুলের যে কটি ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি তা দু-হাতের দশটা আঙুলে গোনা যায়।

সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে বলি, -'দোষ আর কাকে দেব বল ভূদ্দা? আগের দিনের খেলার নমুনা দেখে সবাই বুঝে নিয়েছে আজ পাক্কা পাঁচ-সাত গোলে হারব আমরা। জেনেশুনে কে আর তা দেখতে আসে বল?'

ভূতোদা প্রচণ্ড ধমক দিয়ে ওঠে, -'উদ্‌বেড়ালের মত কথা বলিস না, নরেন। খেলায় হারজিত থাকবেই। তাই বলে মাঠে আসবে না? এই তো আমি। আমি তো জানিই ফেল করব, তবু বছর বছর পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছি না? কিছুই তো করতে হবে না বাপু। সেরেফ আমাদের ফরোয়ার্ড লাইন যখন বল নিয়ে ছুটবে তখন একটু প্রাণ খুলে চিল্লাবি, একটু এনকারেজ করবি। তাও পারিস না? দ্যাখ নরেন, চেয়ে দ্যাখ। এক মাঠ অচেনা মুখ। মনে হচ্ছে, এ যেন গোয়াড়িগঞ্জ নয়, যেন টিটিকাকাতে অলিম্পিক খেলতে এসেছি।'

গজেন অমনি টুক্ করে বলে বসে, -'টিটিকাকাতে কিন্তু কোনদিন অলিম্পিক হয়নি ভূতোদা।' ভূতোদার পাতা-না-পড়া চোখ দুটো যেন রাতের ডিসট্যান্ট সিগনাল। নেড়া তাড়াতাড়ি কোন রকমে ব্যাপারটা ম্যানেজ করে নেবার চেষ্টা করে। বলে, - 'আহাহা, তোরা কথা বুঝিস্ না কেন? ভূতোদা তো বলেনি যে, টিটিকাকাতেই কখনও অলিম্পিক হয়েছে। ও একটা কথার কথা। এতদিন হয়নি বলে ভবিষ্যতেও যে কোনদিন হবে না তার তো কোন স্থিরতা নেই।'

ভূতোদার জ্বলন্ত চোখ দুটো শান্ত হয়ে আসে। আমাদেরও ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ে। গজাটার যেমন বুদ্ধি। এই ক্রিটিক্যাল মোমেন্টে, খেলা শুরু হবার ঠিক আগেই পণ্ডিতি ফলাতে গিয়ে ভূতোদার মেজাজটা খারাপ করে দিয়েছিল আর কি। টিটিকাকা নামটা কদিন আগে ভূগোল মাস্টার মশাইয়ের কাছে শুনেছিলাম মনে হচ্ছে। বেশ জুতসই নামটা। কিন্তু আমাদের বরাত খারাপ! - মারে কেষ্ট রাখে কে?

হতভাগা গজেন এর পরেও বলে বসে, -'না-ভবিষ্যতেও কোন দিন টিটিকাকাতে অলিম্পিক হবে না-'

নেড়া, গোবিন্দ আর আমি তিনজনে একসঙ্গে খেঁকিয়ে উঠি, - 'কেন হবে না? আলবৎ হতে পারে। রোমে হতে পারে, হেলসিঙ্কিতে হতে পারে, বার্লিনে হতে পারে, টোকিওতে হতে পারে, আর শুধু টিটিকাকাতেই পারে না!'

গজেন আবার বলে - 'না, পারে না। কারণ টিটিকাকা কোন দেশ বা শহর নয়। ওটা দক্ষিণ-আমেরিকায় অবস্থিত একটা হ্রদের নাম। চিল্কা, বৈকাল অথবা মানস-সরোবরে কি অলিম্পিক হতে পারে?'

যেন শুনতেই পাইনি আমরা কেউ। তাড়াতাড়ি কথাটা চাপা দিতে বলি, - 'যাকগে মরুগ্গে, ভূদ্দা তুমি কিছু ভেব না। মাথার উপর ভগবান আছেন'-

নেড়া আর এক কাঠি বাড়িয়ে বলে, -'এবং গোল-পোস্টের সামনে ভূতোদা আছেন!'

ভূতোদা কোন জবাব দেয় না। হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে মাঠে নেমে পড়ে।

আমি বলি, - 'গ্লাভসটা আবার খুলছ কেন এখন? এখনি তো খেলা শুরু হবে।'

ভুতোদা হেসে বলে, - 'নরেনটা একটা আস্ত অনড্বান। আমি না ক্যাপ্টেন! দস্তানা পরে শেকহ্যান্ড করা এটিকেট - বিরুদ্ধ, তাও জানিস না বলিবর্দ!'

মনটা খুশীতে ভরে ওঠে। নেড়া আর গোবিন্দও লক্ষ্য করেছে গালাগাল দুটো। নেড়া আমার কানে কানে বলে, - 'একে অনড্বান তাই বলিবর্দ! আজ আগুন ছুটিয়ে খেলবে ভূদ্দা।'

আমি তা জানি। মুড ভাল না থাকলে ভূতোদা কখনও সংস্কৃতে বকা দেয় না। যত মুষড়ে পড়ে ততই ওই ভাষাটা হয়ে পড়ে চাষাড়ে। মেজাজ একটু খুশ হলেই তার সঙ্গে সংস্কৃত প্রত্যয় যুক্ত হতে থাকে। আর মন মেজাজ যখন বিলকুল শরিফ, তখন নির্ভেজাল সংস্কৃতে বকে দেবে। সেগুলো খুব মিষ্টি আদরের; বলিবর্দ, ছুছুন্দর, দণ্ড বায়স, দেড়কানন, মার্জারমুখী; অর্থাৎ বকাবকিগুলোই হচ্ছে ভূতোদার মেজাজের ব্যারোমিটার। তাই হঠাৎ নিখাদ জোড়া সংস্কৃত শুনে আন্দাজ করি, টিটিকাকা যে হ্রদ, এই মর্মান্তিক দুঃসংবাদটা প্রফেসর অনিলচন্দ্রের খুড়োমশায়ের কর্ণগোচর হয়নি।

খেলা শুরু হল। প্রথম থেকেই সি. এম. স্কুল চেপে থাকে আমাদের গোল এলাকা। ঘনঘন আমাদের গোলে আসতে থাকে একের পর এক তীব্র শট। কিন্তু চীনের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে একবারও বলটা গোলে ঢুকতে পারে না। গোলপোস্ট দুটোর মাঝের ফাঁকটা যেন নিরেট পাথরের দেওয়ালে গাঁথা। প্রতিটি শটই প্রতিহত হয়ে ফিরে যায়। হাফ-টাইমের আগে তিন তিনটে কর্ণার-কিক পেল ওরা, কিন্তু গোল হল না। রাইট-আউটের একটা কর্ণার কিক থেকে অনিবার্য একখানা গোল হতে হতে হল না।

হাফ-টাইমের দীর্ঘ টানা বাঁশি বাজল। আমরা লেবু-বরফ নিয়ে ছুটে গেলাম মাঠে। জড়িয়ে ধরি ভূতোদাকে।

নেড়া বলে, দেখেছ ভূতোদা, - 'ওরা ব্যান্ড-পার্টি ভাড়া করে এনেছে! লরির উপর মাইক ফিট করছে, ঐ দেখ। শীল্ড নিয়ে প্রসেশন করবার সব রকম আয়োজন ওরা করছে নিশ্চিন্ত মনে, যেন খেলা জেতা হয়েই আছে। ওরা একেবারে স্যাংঙ্গুইন।'

খুন চেপে যাওয়া এক জোড়া জ্বলন্ত চোখ তুলে ভূতোদা এক নজর দেখে নিল ওদের আয়োজনটা। ব্যান্ড-পার্টি সত্যিই অপেক্ষা করছে। পাতাবাহার পাতা জড়িয়ে লরিটাকে সাজাচ্ছে ওরা। পর পর চার বছর রানার্স-আপ হয়ে আজ তারা - বিজয়লক্ষ্মীর নিশ্চিন্ত আশীর্বাদের স্বপ্ন দেখছে।

ভূতোদা বলে, -'কুছ পরোয়া নেহি, ওরা স্যাঙ্গুইন তো আমরাও স্যাঙ্গুইনারি'।

গোবিন্দ বোধ করি ধরতে পারে না ব্যাপারটা, বলে, - 'স্যাঙ্গুইনারি আবার কি?'

ভূতোদা বলে, - 'ঐ পেঙ্গুইনটাকে জিজ্ঞাসা কর। গ্রামারের এসব কূটকচালি ওর ঠোঁটস্থ।'

গজেনকে দেখিয়ে দেয় সে। গজেনকে ভূতোদা মাঝে মাঝে আদর করে পেঙ্গুইন বলে ডাকে। ম্যালেরিয়ায় ভুগে বেচারির পিলেটা একটু বড় বলেই বোধ করি এই নামকরণ। কিন্তু সে যাক্।

কিন্তু ভূতোদা কি বলতে চায়? শেষ পর্যন্ত সত্যিই একটা খুনোখুনি রক্তারক্তি কাণ্ড বাধিয়ে বসবে নাকি?

হাফ-টাইম শেষ হতেই আমরা আবার ভূতোদার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আবার চাপ পড়তে শুরু করল আমাদের গোল এলাকায়। মাঝমাঠের ওদিকেও যে আধখানা ফাঁকা মাঠ পড়ে আছে সে খবরটা যেন বলটাকে কেউ বলে দেয় নি। সি. এম. স্কুলের ছেলেরা এবার একটা নতুন কায়দা শুরু করল। ওরা বুঝতে পেরেছে যে আমাদের গোলকীপারকে চটাতে না পারলে চলবে না। রেগে মেগে যদি ভুল পজিশন না নেয় ভূতোদা, তাহলে কিছুতেই গোলে বল ঢুকবে না। খেলার প্রথম থেকেই তো ক্রমাগত হো-হো করছিল সবাই মিলে, এখন একেবারে নতুন কায়দায় শ্লোগান দিতে আরম্ভ করে।

আমরা জনাবিশেক মাত্র ক্ষীণজীবী প্রাণী। তাই ওদের মাঠজোড়া ভোঁ-র কাছে আমাদের ভেঁপু যেন বাজলই না। আমাদের গলার আওয়াজ ডুবে গেল নিঃশেষে! সারা মাঠখানাকে ওরা মাতিয়ে তুলল এই নতুন শ্লোগানে। মাঠের এ প্রান্ত থেকে জনা পঞ্চাশ ছেলে একসঙ্গে সুর করে বলে:

বাবা ভূ-তোর বয়-স ক-ত?

ওই গোলপোস্টের পিছন থেকে শত খানেক ছেলে জবাব দেয়: বায়ো-কি ত্যায়ো।

এ প্রান্ত বলে: বা-বা কী বলে?

ও প্রান্ত বলে: বা-বা বলে আ-ও-ও কম।

এ প্রান্ত বলে: আর মা কী বলে?

ও প্রান্ত বলে: মা বলে আ-ও-ও-ও-ও কম!!

আচ্ছা তোমরাই বল, এই প্রশ্নোত্তরের মধ্যে কেউ মাথা ঠান্ডা করে গোল ঠেকাতে পারে? বিশেষত যদি তার বয়স আর পাঁচটা ছেলের চেয়ে সত্যিই কিছু বেশি হয়? ওদের প্রশ্ন আর উত্তর চালাচালিতে মাঠটা যখন গমগম্ করছে, বলটা তখন আমাদের গোলপোস্টের এ কিনার থেকে ও কিনারে আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে।

জালে আটকানো বড় কই মাছ যেমন ঘাই দিয়ে দিয়ে ওঠে, বলটাও তেমনি ওদের ফরোয়ার্ড কজনের মাথায় মাথায়, পায়ে পায়ে ঘাই মারছে অনবরত, গোলের ভিতর না ঢুকে পড়া পর্যন্ত যেন তার নিস্তার নেই। কিন্তু ভূতোদার জাল ছেঁড়া অত সহজ নয়!

ক্রমাগত কিক করে, হেড করে, পাঞ্চ করে ক্লিয়ার করে যাচ্ছে নির্ঘাত গোল। একবারও ভুল হচ্ছে না পজিশান নিতে। চটেনি ভূতোদা। ওরা তাকে চটাবার জন্য 'মা কি বলে' প্রশ্নটার জবাবে 'ও'-টাকে আরও লম্বা করে সুর টেনে টেনে বলছে: আ-ও-ও-ও-ও কম। তা বলুক। হিমালয় পাহাড়কে কি বিদ্রূপে টলানো যায়?

ইতিমধ্যে একটা কাণ্ড ঘটল।

খেলা শেষ হবার আর মিনিট তিনেক বাকি। ভূতোদার ক্লিয়ার করা একটা শট একেবারে আকাশমার্গে গিয়ে পড়ল ওদের হাফ-লাইনের কাছে। ফাঁকা মাঠ। ওদের স্টপার পর্যন্ত পজিশান ছেড়ে এগিয়ে এসেছে গোল দেবার উত্তেজনায়, নিজেদের গোল সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে।

আমাদের রাইট ইন চিরঞ্জীবটা দৌড়োয় ভাল। চমৎকারভাবে অফসাইড বাঁচিয়ে বলটা পায়ে রেখে এগিয়ে গেল। ড্রিবল্ করে একজন-দুজনকে কাটিয়ে নেয়, ব্যস, আর কেউ নেই সামনে। শুধু ওদের গোলকিপার আর আমাদের চিরে। কোনওক্রমে একবার গোলে বলটা মারলেই আমাদের চিরঞ্জীব সত্যিকারের চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে।

আমরা চীৎকার করে উঠি, - এবার গোলে মার, চিরে।

কিন্তু না, চিরঞ্জীব এ চান্স কোনক্রমেই মিস হতে দেবে না। উল্কার গতিতে সে বল নিয়ে এগিয়েই চলে। কাছে, আরও কাছে, আরও কাছে। ওদের গোলকীপার একেবারে নার্ভাস। চিরেটা তখন গোলপোস্ট থেকে মাত্র দশ গজ ঘুরে। আপ্রাণ দৌড়ে ততক্ষণে ওদের লেফট ব্যাক এসে নাগাল পেল চিরেটার। দিলে মোক্ষম একটা সাইড পুশ। কী-কেন হল, ভাল দেখা গেল না, রেফারী পেনাল্টি দিল।

অফসাইড? ফাউল? হ্যান্ডবল? কি? কিছুই কেউ বুঝতে পারি না। আসলে রেফারী নিজেও পড়ে গিয়েছিল বহু পিছনে। সে যখন ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছালো তখন বোঝা গেল ব্যাপারটা। ওদেরই হ্যান্ডবল হয়েছে। লেফট-ব্যাকের। পেনাল্টি এলাকায়। পেনাল্টি। আমরা আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠি। কিন্তু ব্যাপারটা দাঁড়ালো অন্য রকম। মাঠে তীব্র উত্তেজনা। ওদের খেলোয়াড়ের হাতে নাকি বলটা আদপেই লাগেনি। লাইনম্যান সেটা দেখেছিল। অযাচিতভাবে ছুটে এসে কী যেন বলল রেফারীকে। ওদের সারা স্কুলের ছেলেরা তখন রেফারীকে ঠেঙাবার আয়োজন করছে। রেফারী কিন্তু নিজ সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। একবার নির্দেশ দিয়ে ফেলেছেন, আর প্রত্যাহার করবেন না।

বলটা সাজানো হল পেনাল্টি কিকের চিহ্নিত স্থানে।

সারা মাঠে তখন চীৎকার-শেম, শেম, পার্শিয়ালিটি, ঘুষ খেয়েছে। রেফারীকে দেখে নেব।

চিরঞ্জীব শটটা মারবার জন্য প্রস্তুত হয়। হুইসল পড়লেই সে পেনাল্টি কিক্ করবে। কিন্তু আমাদের ক্যাপ্টেন ভূতোদা তার সাড়ে চার ফুট লম্বা উটপাখির মত পা ফেলে উল্কার বেগে এসে পৌঁছালো সেখানে। চিরঞ্জীবকে ডেকে ভূতোদা কি যেন জিজ্ঞাসা করল। কী প্রশ্ন হল তা আমরা শুনিনি; কিন্তু দেখলাম চিরঞ্জীব দৃঢ়তার সঙ্গে না-য়ের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। সারা মাঠ তখনও চেঁচাচ্ছে, -শেম শেম।

নেড়া আমার কানে কানে বলল, - 'নরেন, কেটে পড়। না হলে ওরা একেবারে আলু-কাবলি বানিয়ে ছাড়বে। হ্যান্ডবল আদপেই হয়নি।'

হ্যান্ডবল যে হয়নি তা আমিও বুঝেছি। শুধু আমি কেন সবাই, মায় রেফারী পর্যন্ত। কিন্তু ভুল আত্মমর্যাদার মোহে নিজের জেদ বজায় রাখতেই রেফারী তাঁর নির্দেশটা প্রত্যাহার করলেন না।

আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, চিরঞ্জীব নয়, ভূতোদাই স্বয়ং গোলে পেনাল্টি-কিক করছে। ওদের ক্যাপ্টেন রেফারীকে কি যেন বললে। ভূতোদার সঙ্গেও কি সব কথা হল।

পরে শুনেছিলাম, ওদের ক্যাপ্টেন বলেছিল গোলকীপারের পেনাল্টি শট্ মারার অধিকার নেই। রেফারী নির্দেশ দিয়েছিলেন  -আছে।

ওরা এমনিতেই ক্ষেপে ছিল, তার উপর ভূতোদার শটের তীব্রতার কথা জেলার সব কটা স্কুলই ভাল মতো জানে। ওদের তিন চারজন খেলোয়াড় রেফারীকে ঘিরে দাঁড়ায়, বলে, - না নেই, কোন আইনে নেই।

ভূতোদা ওদের থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, - 'না থাকে, তাহলেই তো ভালো ভাই। গোল হলেও আপনারা প্রটেস্ট করতে পারবেন। আইনে না থাকলে রি-প্লে হবে। কেমন না?'

অকাট্য যুক্তি। ওরা আর বাধা দেয় না।

বলটা সাজিয়ে রেডি হয় ভূতোদা।

আমরাও রুদ্ধ নিশ্বাসে রেডি হয়ে থাকি। সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠতে হবে: গোল!!

 
হুইসল পড়ল।



আর একেবারে সামিয়ানা লক্ষ্য করে উল্টো দিকে কিক করল ভূতোদা। আকাশ মার্গে উড়তে উড়তে বলটা এসে পড়ল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের পায়ের কাছে। শীল্ডটা যেখানে সাজানো আছে তার কাছ বরাবর।

সারা মাঠ স্তম্ভিত। এ কি তালকানা রে বাবা। শুধু হাততালি দিচ্ছেন সস্ত্রীক ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব।

ড্র হয়ে গেল আবার।

খেলার শেষে বৃষ্টি নামল ঝেঁপে। আমরা কে কোথায় ছিটকে পড়লাম। নেড়া, ক্যাবলা, গজেন আর আমি ছুটতে ছুটতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম ক্রিশ্চান পাড়ার একটা চায়ের দোকানে।

নেড়া কোঁচার খুঁটে মাথাটা মুছতে মুছতে বলে, -'ভূদ্দার কান্ডটা দেখলি? নিশ্চিত জেতা-খেলা ড্র হয়ে গেল ফের। এতবড় তালকানা দেখেছিস কখনও? কোন দিকে গোলপোস্ট আর কোন দিকে মারলে শট।'

আমি বলি, -' আমার মনে হয়, ভূদ্দা ইচ্ছে করেই উল্টোদিকে শট মেরেছিল।'

গজেন বলে, - 'বটেই তো। শেয়াল যেমন ইচ্ছে করেই টক আঙুর ফল খায়নি।'

আমি চুপ করেই যাই। নেড়া বলে, - 'কী দরকার ছিল বাপু তোর সর্দারি করতে যাবার? গোলকী আছিস্। তাই থাক না বাপু। আবার পেনাল্টি শট মারার শখ কেন? চিরেটাকে চান্স দিলে ঠিক গোল করত সে। হাজার হোক সে ফরোয়ার্ডে খেলে।'

আমার কেমন যেন খারাপ লাগে। ভূতোদাকে আমি সত্যিই ভালবাসতাম। ওকে নায়ক করে লিখব এই ছিল তখন আমার জীবনের অ্যাম্বিশান। ওর কাছে ম্যাজিকও শিখতাম লুকিয়ে। আড়ালে ওকে ডাকতাম 'গুরুদেব'। গুরুনিন্দা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।

ক্যাবলা বলে, -'দেখ না, কাল ক্লাসে কী কান্ডটা করি। ভূদ্দার সর্দারি ভাঙতে হবে।'

বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। আমরা যে যার বাড়ি ফিরে যাই। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, - কেন এমন তাল-কানার মত উল্টো দিকে শট মারল ভূদ্দা? অনেক ভেবেও কোন কূলকিনারা করতে পারি না।



পরদিন স্কুলে গিয়ে আমরাই হতভম্ব!

দশটা তখনও বাজেনি। স্কুল গেটের কাছে একটা চাপ ভিড়। ছেলেরা কেউ ভিতরে ঢুকতে পারছে না। পিকেটিং হচ্ছে নাকি? তার মানে স্কুল হবে না। কিন্তু ভুলটা ভাঙলো পরমুহূর্তেই। দারোয়ানের টুলটা টেনে নিয়ে তার উপর দাঁড়িয়ে ভূতোদা বক্তৃতা দিচ্ছেন: 'গাড়োল, গিদ্ধড় কোথাকার - সব এসে জুটেছে এখানে? তোমাদের লজ্জা হয় না। এসব মস্করা করবার সাহস ওরা পায় কোথেকে। অ্যাঁ? তোমাদের ক্যাপ্টেনের বয়স 'বায়ো না তেয়ো? মা বলে আয়ো কম' - এসব কী ইতরামো? ওদের গোটা স্কুলটাই খেলার মাঠে যেতে পারে। তোমরা পার না? তোমরা মানুষ না বাছুর? বাছুর হলেও তবু কাজ হত, মাঠে গিয়ে কিছু হাম্বা হাম্বা করতে পারতে।'

বুঝতে পারি, কালকে পেনাল্টি ফস্কে যেতে মর্মান্তিক চটেছে ভূতোদা। একটাও সংস্কৃত গাল নেই ওর মুখে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসেন হেডমাস্টার মশাই। ডাকেন, বাবা ভূতনাথ।

টুপ করে টুল থেকে নেমে পড়ে ভূতোদা। আমচুরের মত কাঁচুমাচু মুখে বলে,- 'স্যার?'

হেডমাস্টার মশাই ভূতোদাকে কখনও ধমক দিতেন না। মিষ্টি করে বলেন,-' এসব কী হচ্ছে বাবা ভূতনাথ? তুমি নিজে পড়াশুনা না করতে চাও ক্ষতি নেই, কিন্তু এইসব সুকুমারমতি ছেলেদের মাথা খাচ্ছ কেন বাপ?'

ভূতোদা ঘাড়টা চুলকে আমতা আমতা করে, - 'ঘণ্টা এখনও বাজে নি স্যার।'

হেডমাস্টার মশাই বলেন, - 'বেজেছে বাবা। তাণ্ডব নাচতে ব্যস্ত ছিলে, তাই তোমার কানে যায়নি। তাছাড়া তোমার ঘন্টা তো এ স্কুলে বাজবে না বাবা। তোমার ঘন্টা বেজেছে স্বর্গে। কয়েক বছর ধরেই তা বেজে চলেছে।'

সবাই মুখ টিপে হাসছে। দারুণ অপমানিত হয়েছে ভূতোদা। মহিষাসুরের মত মুখটা থমথম করছে তার। আমরা ক্লাসে ঢুকে পড়ি। ভূতোদাও গিয়ে বসে ওর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এজমালি ভূখণ্ডে, থূড়ি - কাষ্ঠখণ্ডে। লাস্ট বেঞ্চির কোণায়। আমাদের কারও সাহস হয় না ভূতোদাকে কিছু বলার। ফার্স্ট পিরিয়ডে ছিল ট্রানস্লেশন, ঘণ্টা পড়ে গেল। ন্যাপলা একবার সাহস করে ভাববাচ্যে বললে, - 'ওঃ, কাল ভূদ্দা যা খেলেছিল একেবারে আগুন ছুটিয়ে।' ভূতোদা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে একবার তাকায় নেপালের দিকে। ভাগ্যে এ কলি যুগে ব্রহ্মতেজে মানুষ ভস্ম হয়ে যায় না। না হলে ন্যাপলা এতক্ষণে যাকে বলে সেই 'গো-ওয়েন্ট-গন'।

আমাদের আর কারও সাহস হল না ভুতোদাকে ঘাঁটাবার। পর পর দুটো পিরিয়ড কেটে গেল নির্বিঘ্নে। শেষ পর্যন্ত টিফিনের লম্বা ঘণ্টা বাজল। আমার টিফিন বাক্সে ছিল কুচো গজা আর ল্যাংচা। আমি জানতাম, ল্যাংচা বস্তুটা ভূতোদার খুব প্রিয়। ওর দিকে টিফিন বাক্সটা বাড়িয়ে ধরে বলি, - 'কাল ভূদ্দার খেলা দেখে মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই ডালহৌসির ডেভিসকে। আর সেই ইয়র্কশায়ার টিমের সেই সাতফুট লম্বা গোলকীটাকে, - কী যেন তার নাম ভূদ্দা?'

ডালহৌসি টিমে ডেভিস বলে সত্যিই কোন গোলকীপার কস্মিনকালে ছিল কিনা তা আমার জানা নেই, ইয়র্কশায়ার টিমের খেলাও আমি জীবনে দেখিনি। নামগুলো ভূতোদার কাছে শুনে শুনে আমাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। ভূতোদা নিঃশব্দে ল্যাংচাটা তুলে নিল টিফিন বাক্স থেকে। তা নিক, কিন্তু কথাই বলে না যে। অবশেষে আধখানা ল্যাংচা আমার হাতে গুরু প্রসাদী ভেঙে দিয়ে মুখভঙ্গি করে চিবোতে থাকে। ল্যাংচার পর নিজেই একমুঠো কুচোগজা তুলে নিল। কিন্তু না, কোন কথা নেই তার মুখে। গোবিন্দ আর কী করে, নিজের টিফিন বাক্স থেকে একটা পেয়ারা বের করে ভুতোদার হাতে দেয়। এটাও গ্রহণ করে ভূতোদা। মটর বলে, - 'ছুরি দেব ভূদ্দা? কেটে কেটে খাবেন?'

পেন্সিলকাটা একটা ছুরি সে পকেট থেকে বের করবার উপক্রম করে। ভুতোদা ধমকে ওঠে, -'তুই চুপ কর মর্কট।' মর্কট! কথাটা বাংলা না সংস্কৃত! কানে কানে প্রশ্ন করি গজাকে। গজা বলে, -'সংস্কৃতই হবে রে! মনে নেই সেদিন পণ্ডিতমশাই তোকে মর্কট বলেছিলেন? পণ্ডিতমশাই কখনও বাংলা গাল দেন না।'

আমাকে মর্কট বলে গাল দিয়েছিলেন! গজাটা কি ডাহা মিথ্যুক রে বাবা! কিন্তু না, নিজেদের মধ্যে খাওয়া-খাওয়ি করে কেস খারাপ করবার সময় এখন নয়। ভুতোদার মুখে সংস্কৃত-ঘেঁষা বুলি যখন শোনা গেছে, তখন ফাঁড়া এ যাত্রায় কেটে গেছে বুঝতে হবে।

সুতরাং আর ভয় নেই। সবাই মিলে চেপে ধরি ভূতোদাকে। যা হবার তা তো হয়ে গেছে। ভূতোদার ভাষায় সে সব কথা এখন 'যাকগে-মরুগ্গে। এখন আমাদের কী করতে হবে ভূতোদা বলুক। আমরা লীডারের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।

শেষ পর্যন্ত ভূতোদা উঠে দাঁড়ায়।

টিচারের টেবিলটার কাছে উঠে গিয়ে শুরু করে বক্তৃতা।

- 'খেলার জয়-পরাজয় অনিশ্চিত। সেটা কিছু বৃহৎ কথা নহে। কিন্তু ঐ দগ্ধানন বালখিল্য বাহিনী তোমাদের ক্যাপ্টেনকে চিপিটক নিষ্পেষণ করতে চায়, এ অপমান অসহ্য। কেন? আমাদেরও কি গলা নেই, আমরা কি নিষ্কন্ঠক কবন্ধ?'

আগুন ছুটিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে ভূতোদা। নির্ভেজাল সংস্কৃত বুলি। আমরা দু-তিন জনে জিবেগজাটার মুখ চেপে ধরে থাকি। 'চিপিটক নিষ্পেষণ' যে চিঁড়েচ্যাপ্টা আর 'নিষ্কাষ্ঠক মানে যে কাষ্ঠহীন, তা আমরা ঠিকই বুঝে নিয়েছি। শুধু ভয়, ঐ গজাটাকে কখন হয়ত বলে বসবে, সমাসটা ঠিক নয়, আর অমনি ফ্লো আটকে যাবে ভূতোদার।

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, সে দুর্ঘটনা ঘটতে পারল না আমাদের সমবেত প্রচেষ্টায়।

ভূতোদা একনাগাড়ে বলে চলেছে- 'পণ্ডিতমশাই কী বলেন শুনিসনি? 'যত্নে কৃতে যদি ন সিদ্ধতি, স্টোভে সিদ্ধতি খলু।' তার অর্থ কি? অর্থাৎ কিনা এক হাঁড়ি ভাত যদি সিদ্ধ করতে চাও তাহলে হাঁড়ির গায়ে হাত বুলিয়ে বাপু-বাছা করলে কিচ্ছুটি হবে না। স্পিরিট ঢাল, স্টোভ জ্বালো, পাম্প কর,- ব্যস্। আর দেখতে হবে না, কাঁকরমণি চালও দশ মিনিটে সিদ্ধ হয়ে যাবে। এর তাৎপর্য কি? কষ্ট কর কেষ্ট পাবে, বসে বসে চিন্তা করলে কিছুটি হবে না।'

কিছু একটা বলার জন্যে ছটফট করতে থাকে গজা। কিন্তু আমরা চেপে ধরে থাকি তাকে।

নেড়া বলে, - 'বেশ হুকুম কর। আমাদের ক্লাসে বেয়াল্লিশটা ছেলে আছে, তুমি যদি চাও, আমরা সব্বাই যাব। চাই কি অন্যান্য ক্লাসেও গিয়ে ক্যানভাস করে আসতে পারি।'

ভূতোদা বলে, - 'দরকার নেই ও মেষযুথে। দ্বা-চল্লিশই যথেষ্ট। আমি মন্ত্র বলে ঐ দ্বা-চল্লিশকেই দশগুণ বাড়িয়ে ফোর-ফট্টি করে দেব।'

বলে কি ভূতোদা? মন্ত্র বলে সে এক টাকার নোটকে দশ টাকার নোট করতে পারে বলে বেয়াল্লিশজন ছেলেকে দশ গুণ বাড়িয়ে চারশ-চল্লিশজন করে দেবে। বিস্ময়ে একটু অভিভূত হয়ে পড়ি আমরা।

গজার মুখ থেকে অসতর্ক মুহূর্তে হাতটা আলগা হয়ে গেছে। আর তৎক্ষণাৎ ঘটে গেল সর্বনাশ। গজা সুযোগ পাওয়ামাত্র বলে বসে, বেয়াল্লিশকে দশ দিয়ে গুণ করলে চারশ চল্লিশ হয় না ভূদ্দা। ভূতোদা গর্জে ওঠে, আলবৎ হয়। ম্যাজিশিয়ান কী না পারে?

গজাও ক্ষেপে ওঠে, - 'ম্যাজিশিয়ান হয় তো সব পারে, পারে না শুধু অঙ্ক শাস্ত্রকে নস্যাৎ করতে। আমি বলছি বেয়াল্লিশকে দশগুণ করলে চারশ কুড়ি হওয়ার কথা।'

ভূতোদা এঁড়ে তর্ক শুরু করে, - 'না, তা হয় না। তা যদি হত, তাহলে কাল পেনাল্টিতে গোলও হত।'

গজা বলে, - 'হেত্তেরি? কী আবোল-তাবোল বকছ। আমি বলছি অঙ্কের কথা। ফর্টি টু ইনটু টেন ইজ্ ইক্যোয়াল টু' - মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ভূতোদা বলে, - 'ফোর-ফট্টি।'

গজাও গর্জে ওঠে,- 'আজ্ঞে না। কষে দেখ - ফোর টোয়েন্টি।'

আর যায় কোথায়? ভূতোদা যেন দক্ষযজ্ঞের আসরে নামল, - 'কী বললি? আমি ফোর – টোয়েন্টি! মানে জোচ্চোর?'

আস্তিন গুটিয়ে ছুটে আসে ভূতোদা, - 'কেন? চোরাই পেনাল্টি গোলে মারিনি বলে আমি ফোর-টোয়েন্টি? আয় তুই কত বড় জিবেগজা দেখি। না চিবিয়ে গিলেই খাব আজ তোকে।'

অনেক কষ্টে আমরা সবাই মিলে তাকে থামাই। গজাটারই দোষ। আমরা ক্লাশশুদ্ধ ছেলে জানি, ফোর-টোয়েন্টি বললে ভূতোদা খুব ক্ষেপে যায়, আর ও হতভাগাটা তা জানে না? ভাগ্যক্রমে ঠিক তখনই টিফিন পিরিয়ড শেষ হয়ে গেল। সতীশবাবু ক্লাস নিতে এলেন। এসেই বলেন, -'ভূতনাথ, অত চীৎকার করছিলে কেন? যাও সীটে গিয়ে বস।'

ভূতোদা একটু নরম হয়ে বলে, - 'আমাকে ছুটি দিন স্যার, বাড়ি যাব। - কেন? বাড়ি যাবে কেন? কি হয়েছে তোমার?'

- 'হয় নি কিছু। সের খানেক ময়দা কিনে রেখেছি, আঠা বানাতে হবে।'

-'আঠা বানাবে? কি হবে এত আঠা দিয়ে?'

- 'আজ বিকেলে যে আমাদের ফাইনাল খেলা।'

সতীশবাবু অবাক হয়ে বলেন, - 'কিছুই বুঝলাম না, বাবা ভূতনাথ। তোমারই মাথা খারাপ না আমার? ফাইনাল খেলার সঙ্গে ময়দার আঠার কী সম্পর্ক?'

-'সে স্যার আপনি বুঝবেন না। আমি যাই বরং। হেডমাস্টার মশাইকে কিছু বলবেন না; আমি কিন্তু স্যার আপনার অনুমতি নিয়েই যাচ্ছি।'

বিস্মিত সতীশবাবু কিছু বলার আগেই বইখাতা নিয়ে দিব্যি চলে গেল ভূতোদা।

আমরা কেউ হলে নিশ্চিত বেত খেতে হত। কিন্তু ভূতোদার সাত খুন মাপ।সবাই জানে, সে একটা খ্যাপাটে গোছের। ও যেন নিয়মের ব্যতিক্রম। দিব্যি পেয়ারা চিবোতে চিবোতে বাড়ি চলে গেল সে। বিকেল বেলা মাঠে গিয়ে দেখি আমাদের ক্লাসের সবাই এসেছে। অবশ্য আমরা সর্বসমেত জনাপঞ্চাশ আর ওরা অন্তত দুশ। গলাবাজিতে জিতবার কোন আশাই নেই। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব সস্ত্রীক এসে বসলেন। তিন দিন ধরেই আসছেন তিনি। শুনেছি মেমসাহেবই পুরস্কার বিতরণ করবেন।

আমাদের দলের দশজন খোলোয়াড় এসে গেছে। কিন্তু ভূতোদা কই? কী কেলেঙ্কারী। আসল লোকই গরহাজির!

সময় হয়ে গেছে। রেফারী হুইসল দিল।

দুটো টিম মাঠে নামল; আমাদের দশজন। এমন সময় একটা সাইকেলে চেপে এসে পৌঁছালো ভূতোদা। তার পিছনে পিছনে এল একটা সাইকেল রিকশা।

তাতে এক রিকশা-বোঝাই কাগজের চোঙা। আমরা তো অবাক। এত চোঙা এল কোথা থেকে? আর কোন ভূতের বাপের শ্রাদ্ধেই বা লাগবে এগুলো?

এক লহমায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল ভূতোদা। অদ্ভুত ওর বুদ্ধি! ওর কাকা হচ্ছেন ওভারসিয়ার কলেজের ড্রইং টিচার। ড্রইং পরীক্ষার বড় বড় কাগজ ছিল কাকার হেপাজতে। আগের বছরের পরীক্ষার খাতা। ভূতোদা ময়দার আঠার সাহায্যে তাই দিয়ে বড় বড় চানাচুরের ঠোঙা বানিয়েছে। ভূতোদার ম্যাজিক অব্যর্থ। ফর্টিটু ইনটু টেন ইজ ইক্যোয়াল টু ফোরফর্টি। ওরা দুশ ছেলে যতটা চিৎকার করে আমরা পঞ্চাশ জনে করলাম তার ডবল, - চোঙার গুণে। দু-দশ মিনিটেই ওদের গলা গেল বসে। আগের দুদিনও ওরা এক নাগাড়ে চিৎকার করেছে। আর কত পারবে? চোঙামুখো আমরা পঞ্চাশ জনেই মাঠখানাকে সরগরম করে রাখলুম।

ওরা একবার করে গোল মিস্ করে আর ন্যাপলা চোঙা ফোঁকে: সি. এম. এস. কটা গোল মিস্ করল?

আমরা সমস্বরে বলি: বায়ো কি ত্যায়ো।

যে ছেলেটি এই মাত্র গোল মিস্ করেছে তার নাম ধরে ন্যাপলা বলে, - জগাই কি বলে?

আমরা সকলে একযোগে সুর করে বলি: জগাই বলে আ-ও-ও বেশী।

আমাদের চোঙার চিল্লানিতে ওরা একেবারে ঠাণ্ডা। একশ জোড়া ওয়েট-ক্যাট! ওদের ফরোয়ার্ড লাইনের সব কটা খেলোয়াড় এ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে আরও নার্ভাস হয়ে পড়ে। তালকানার মতো এলোপাতাড়ি আউটে মারতে থাকে বারে বারে। গোলপোস্ট গুলিয়ে যায়।

আমরা তৎক্ষণাৎ 'ও' টাকে আরও দীর্ঘায়ত করি: মাধাই বলে আ-ও-ও-ও বেশি। শেষকালে এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে, কেউ আর সাহস করে বলটাকে গোলে মারতেই চায় না। পাছে মিস্ করলে আমরা তার নাম ধরে বিদ্রূপ করি। গোলের কাছাকাছি এসে ফরোয়ার্ড দেয় ইনকে, ইন দেয় আউটকে, আউট ব্যাক পাশ করে হাফকে। আমাদের ডিফেন্সকে আর কষ্ট করতে হয় না। ওরা নিজেরাই পায়ে পায় বলটাকে পিছিয়ে নেয়। আমরা ওদের সে দশা দেখে হেসে বাঁচিনে।

শেষ পর্যন্ত আবার গোললেস ড্র হয়ে গেল।

স্থির হল ছ-মাস করে থাকবে শীল্ডটা এক এক স্কুলে। দু দলই যুগ্মবিজয়ী। প্রাইজ দেওয়ার সময় ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বললেন, কোন পক্ষই যে গোল করতে পারেনি, এতে আমি খুশীই হয়েছি। দু দলেরই কৃতিত্ব সমান সমান। কে আগে শীল্ডটা রাখবে সেটা আমি 'টস' করে স্থির করব।

ভূতোদা তার কন্দর্পকান্তি বপুখানিকে এক পা বাড়িয়ে বলে, - 'আমি একটা কথা বলতে পারি স্যার?'

ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব বলেন - 'হ্যাঁ, বলো-বলো।'

- 'আপনি টস্ করবেন না, স্যার।'

- 'টস্ করব না? তাহলে কাকে প্রথমে শীল্ডটা দেব?'

- 'আমি বলব স্যার। আপনি সি. এম. এস-এর ক্যাপ্টেনকেই প্রথম ছ'মাসের জন্য শীল্ডটা দিন।'

ম্যাজিস্ট্রেট পত্নী অবাক হয়ে বলেন, - 'কিন্তু কেন তুমি এমন কথা বলছ?' ভূতোদা বলে, - 'শীল্ডটা আমরা চার বছর ধরে রাখছি। আজ যদি আমরা সমান সমান হয়ে থাকি তাহলে কৃতিত্বটাতো ওদেরই। তারপর মেমসাহেবের দিকে ফিরে বলল, ধরুন স্যার, ওরা ব্যান্ড পার্টি এনেছে, লরি এনেছে, আমরা তা আনিনি। শীল্ড না পেলে ওরা দুশ'জন ছেলে হতাশ হবে, আমরা মাত্র পঞ্চাশ জন।' ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব খুশী হয়ে ওর সঙ্গে শেকহ্যান্ড করে বলেন, -' ঠিক আছে, তাই হোক।'

তারপর আমাদের দিকে ফিরে বলেন, - 'আমি শুধু একথা বলব, ফুটবলটা শুধু পা দিয়ে খেলার নয়, হৃদয় দিয়ে খেলা। তোমরা দেখেছ গতকাল রেফারী একটা পেনাল্টির নির্দেশ দিয়েছিলেন। দর্শকদের মতে নির্দেশটা ঠিক হয় নি। কিন্তু রেফারীর নির্দেশ, তা সে ঠিকই হোক আর ভুলই হোক মেনে নিতেই হবে। এই হচ্ছে খেলার আইন। নিয়মানুবর্তিতা খেলার একটা প্রধান অঙ্গ। কিন্তু সত্য ধর্মের স্থান তারও উপরে। দুর্গেশ দুমরাজের গল্প নিশ্চয় জান তোমরা। আমাদের ভূতনাথও কাল ঐ রকম একটি কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। খেলার ধর্ম আর সত্য ধর্মের দ্বন্দ্ব সে চমৎকারভাবে মিটিয়ে দিয়েছিল উল্টোদিকে বলটাকে কিক করে। সে দেখিয়ে দিয়েছে খেলোয়াড়ি মনোভাব কাকে বলে। আমি আজ তিন বছর এই জেলায় আছি। বহুবার আমি শ্রীমান ভূতনাথের খেলা দেখেছি। শুনেছি তোমরা ওকে একটা খেতাব দিয়েছ-'পেনাল্টি-ঈটার।' আমি আজ শ্রীমান ভূতনাথকে আর একটা নতুন খেতাব দিলাম, - দুর্গেশ দুমরাজ দি সেকেন্ড!'

মিসেস্ ডি. এম. কী বুঝলেন তা তিনিই জানেন। তিনিই হাততালি দিলেন সবচেয়ে বেশি।

নিশ্চিত হারের হাত থেকে রেহাই পেয়ে ভুতোদা আগেই আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল। নতুন খেতাব পেয়ে সে যেন যোলোখানা হয়ে গেল!
 
আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এই গল্পটি শুনতে হলে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
শীল্ড ফাইনাল। নারায়ণ সান্যাল। মজার গল্প। গল্প পাঠে : অনুব্রতা Narayan Sanyal. Comedy Story
 
এই সিরিজের অন্যান্য গল্প: