Showing posts with label কল্পবিজ্ঞান. Show all posts
Showing posts with label কল্পবিজ্ঞান. Show all posts

মৃত্যুতালিকা


লেখক: সুবোধ সরকার

জলে-ডোবা কাদার ভেতর দিয়ে অবয়বহীন প্রাণীগুলো ধীরে ধীরে মহাকাশযানটির দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের শরীরে কোনোও হাড় নেই। তুলো- ভর্তি বস্তার মতো মনে হচ্ছে।

তাদের অগ্রগতি কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। প্রথম দিকে দু’একটি প্রাণীর শরীর বিশেষ রশ্মির সাহায্যে ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফেটে ছড়িয়ে পড়া জেলি থেকে আবার নতুন জন্ম নিয়ে তারা সংখ্যায় ক্রমশ বেড়ে যেতে লাগল। চোখ নেই, মুখ নেই, পা নেই, হাত নেই-- প্রাণীগুলো ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে। তাদের লক্ষ্য ওই মহাকাশযান।

ডঃ যোশি খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। তাঁর ওপর দায়িত্ব অনেক। অনেক মানুষের জীবন নির্ভর করছে তাঁর সিদ্ধান্তের উপর। যা করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। পৃথিবী থেকে এসে একমাত্র তাঁরাই পেরেছেন এই গ্রহে মহাকাশ- স্টেশন তৈরি করতে। কিন্তু তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন, ধ্বংস মাত্র কয়েক.হাত দুরে অপেক্ষা করছে। গত দু’দিনের ভেতরেই ওই ভয়াবহ প্রাণীগুলো তাঁদের দুটি মহাকাশযান একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। তাদের শরীর থেকে নির্গত একরকম তীব্র অ্যাসিড ধীরে ধীরে মহাকাশযানদুটিকে গলিয়ে কাদার ভেতর মিশিয়ে দিয়েছে।

কমান্ডার ডঃ যোশি তাঁর লম্বা দাড়িতে একবার হাত বেলালেন। তারপর মনে-মনে বললেন, দেখা যাক।

মিস্টার রঙ্গনাথন, যিনি এই মহাকাশ-স্টেশনের প্রধান টেকনোলজি অফিসার, এখনও আশা ছেড়ে দেননি। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে প্যাকেটের মুখটা খুলে ডঃ যোশির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, “একটা ব্যবস্থা করা গেছে, চোখে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু বিশেষভাবে প্রস্তুত একরকম রশ্মি দিয়ে একটা দেওয়াল তুলে দেওয়া গেছে সামনের দিকটায়, কিন্তু তা দিয়ে তাদের বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে না।” মিস্টার রঙ্গনাথন কথাগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই বলতে পারলেন। তাঁর খুব আশ্চর্য লাগছে প্রাণীগুলোর কথা ভেবে।

“আমাদের এই স্টেশন ছেড়ে যেতে হবে,”-খুব দ্রুত এই সিদ্ধান্তে এলেন ডঃ যোশি। যত দূর তাঁর চোখ যায়, দেখতে পেলেন বিশাল জলাভূমিটা একটা থকথকে জন্তুর মতো এগিয়ে আসছে।

প্রাণীগুলোকে আলাদা ভাবে চেনা যাচ্ছে না আর।

মিস্টার রঙ্গনাথন বললেন, “ছেড়ে যাব ঠিকই, কিন্তু আপনি কি প্রাথমিক সমস্যাটা জানেন, স্যার?”

“হ্যাঁ জানি”, ডঃ যোশি বললেন। তারপর সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে খুব বিষণ্ণ কন্ঠে যোগ করলেন, “আমাদের দলের কুড়িজনকে এখান থেকে চলে যেতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে মৃত্যুর জন্য, মহাকাশযানটি সবাইকে নিয়ে যেতে পারবে না।”

“কারা-কারা যেতে পারবে তার তালিকা কি প্রস্তুত?” প্রশ্নটা এল ডঃ যোশির পেছন থেকে। তিনি ঘুরে দেখলেন,পাইলট রাও। রাও পাইলট হিসেবে অনন্য। তাঁর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। “আমার নাম যেন একেবারে শীর্ষে থাকে”-- হাসতে হাসতেই কথাগুলো বললেন পাইলট রাও। কিন্তু বোঝা যায় সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে রয়েছে দুটো জিনিস। তা হল -- অহংকার আর নিষ্ঠুরতা।

“দুঃখিত, পাইলট রাও, আমরা কেউই অপরিহার্য নই -- ডঃ যোশি খুব স্পষ্ট করে উচ্চারণ করলেন কথাগুলো।

“কিন্তু ভুলে যাবেন না কমাণ্ডার, এখান থেকে মহাকাশযানটিকে নিরাপদে নিয়ে যেতে আমিই সবচেয়ে সক্ষম ব্যক্তি।”

পাইলট রাওয়ের চোখ চিকচিক করে উঠল। তিনি যখন ক্রমশই উত্তেজিত হয়ে উঠছেন, তখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন তাঁরই সহযোগী পাইলট অবন মুখার্জি। খুবই কম বয়স তাঁর, কিন্তু দক্ষতা তাঁরও আছে। তিনি রাওয়ের দুটো হাত নিজের হাতের ভেতর নিয়ে বললেন, “এটা কী হচ্ছে পাইলট রাও, আপনি কি বুঝতে পারছেন না জীবন ও মৃত্যুর ব্যাপারে আমরা এখানে সবাই সমান। আপনি শান্ত হোন।”

“ঠিক আছে, সবাইকে ডাকা হোক, কী মনে হচ্ছে, কতজন যেতে পারবে? পাইলট রাও কথাগুলো বলে খুব বিশ্রীভাবে ডান ভুরুটাকে বাঁকালেন।

সেইদিকে তাকিয়ে ডঃ যোশি বললেন, “সেরকম কিছুই ঠিক করা হয়নি, সিদ্ধান্ত যা নেবার নেব আমরাই, কিন্তু কারা কারা যেতে পারবে তার তালিকা তৈরি করে দেবে আমাদের কম্পিউটার ক, খ, গ।”

ডঃ যোশি কম্পিউটারের কি- বোর্ডের সামনে এসে বসলেন। একটি মহাকাশযান, একশো চল্লিশ জনকে বহন করতে সক্ষম। সুতরাং একশো চল্লিশটি নামের তালিকার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন ডঃ যোশি। ডঃ যোশি পেছন ফিরে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা সমস্ত সেকশনে খবরটা পাঠিয়ে দিতে পারেন।”

সেন্ট্রাল কন্ট্রোল এরিয়াতে প্রত্যেকে অপেক্ষা করতে লাগলেন কম্পিউটার কার-কার নাম বাদ দেয় সেটা দেখার জন্য। প্রত্যেকের ভাগ্য ঠিক করে দিচ্ছে ওই ক, খ, গ। কম্পিউটার রোলার থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল নাম।

“আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিই”-- আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বললেন পাইলট রাও। ব্যাগ গোছাতে চলে যাচ্ছিলেন পাইলট রাও।

হঠাৎ তাঁকে থামালেন ডঃ যোশি।

“না পাইলট রাও, এই মহাকাশযানটিকে নিরাপদে পৌঁছে দেবার জন্য কম্পিউটার নাম করেছে আপনার সহযোগী পাইলট অবন মুখার্জির। ভাগ্যবানদের তালিকায় আপনার নাম নেই।” ডঃ যোশি পাইলট রাওয়ের মুখের দিকে তাকালেন। একটু থামলেন। তারপর বললেন “ভাগ্যবান ১৪০ জনের তালিকায় আমারও নাম নেই।”

“আমার নাম নেই? যাকে আপনারাই বলেন, দি বেস্ট ফ্লায়ার! আর কতগুলো যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি ওই কম্পিউটার মৃত্যু-পরোয়ানা দেবার কে? দিক, আমি মানছি না।” কথাগুলো পাইলট রাও বলার সময় দেখা গেল, তাঁর ঠোঁটের ডান দিকের কোণটা কাঁপছে।

“আমি কম্পিউটারের সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে মেনে নিয়েছি।” বললেন ডঃ যোশি। “আপনি চিরকাল আমাদের শুনিয়ে এসেছেন আপনি কত বড় মাপের জিনিয়াস, সেটা এখন প্রমাণের সময় এসেছে পাইলট রাও। কথা শেষ করে ডঃ যোশ্মি তাঁর পকেট থেকে নিজের রুমাল বের করে রাওকে দিলেন। পাইলট রাও ঘামতে শুরু করেছেন।

“আমার খুবই খারাপ ল!গছে, পাইলট রাও, আমি খুবই বিষণ্ন বোধ করছি,” পাইলট রাওয়ের পিঠে হাত রেখে অবন মুখার্জি দুঃখ প্রকাশ করলেন। এক ঝটকায় তাঁর হাত সরিয়ে দিয়ে পাইলট রাও ধমক দিয়ে উঠলেন, “তুমি একজন সামান্য আ্যাসিসট্যান্ট, আমার পিঠে হাত রাখার যোগ্যতা এখনও তোমার আসেনি।”

“এভাবে আর আমাদের সময় নষ্ট করা যাবে না”-- জানালেন মিস্টার রঙ্গনাথন। তিনি এও জানালেন, আরও এগিয়ে এসেছে সবুজ কাদার জলাভূমি। কমান্ডার ডঃ যোশি ক্যাম্পের ভিতরে এলেন। পরিষ্কার গলায় কোনও আবেগ না রেখে তিনি মাইক্রোফোনের ছোট্ট মুখটিতে ঘোষণা করলেন হতভাগ্যদের নাম। ডঃ যোশির কণ্ঠ সমস্ত ঘরে-ঘরে পৌছে গেল। মৃত্যু-তালিকা পাঠ করার সময় যে নামটি তিনি প্রথমে পড়লেন, সেটি তাঁর নিজের।

তিনি প্রত্যেকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে জানালেন, “যাঁরা মৃত্যু তালিকায় আছেন তাঁরা সেন্ট্রাল কমান্ডে রিপোর্ট করুন অনুগ্রহ করে, আর অন্যরা চলে যান মহাকাশযানের কাছে, জিনিসপত্র যা নেবেন তা যেন কখনওই তিন পাউণ্ডের বেশি না হয়” -- বাঁ হাতের চেটো দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ডঃ যোশি আবার বললেন, “আমরা যাঁরা এখানে থেকে গেলাম, আপনাদের শুভ কামনা করি, আপনারাও আমাদের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবেন আশা করি।”

মুহূর্তের মধ্যে ছোটাছুটি লেগে গেল। দেখা গেল খুব দ্রুত এ-ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু মৃত্যু-তালিকার তেইশজনের অনেকেই বুঝতে পারলেন, যাঁরা ভাগ্যবান তাঁদের অনেকেই তাঁদের দিকে তাকাতে পারছেন না। ভাগ্যবান ও ভাগ্যহীন- এরকম দুটো দলে ভাগ হয়ে গেলেন তাঁরা, যা কিছুক্ষণ আগেও ছিল না।

করিডর দিয়ে যাবার মুখে পাইলট রাও অবন মুখার্জির সামনে এসে দাঁড়ালেন, “তোমাকে কি আমি চিরকাল আমার ছোটভাইয়ের মতো দেখে আসিনি, অবন? আমি যা জানি, তোমাকে কি সব শেখাইনি? অবন, যে করেই হোক আমি বাঁচতে চাই।”

অবন মুখার্জি খুব ভয় পেয়ে গেলেন। তাঁর পাইলটের এরকম ভেঙে-পড়া তিনি কখনও দেখেননি। তিনি বুঝতে পারলেন না কী উত্তর দেবেন। ঠিক সে সময়ই সেখানে উপস্থিত হলেন ডঃ যোশী।

“আমি শুনতে পেয়েছি পাইলট রাও, আমি আশা করব এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আপনি পাঁচ নম্বর লেসার ব্যাটারির কাছে চলে যাবেন।”

“কমান্ডার, আপনি জানেন পৃথিবীতে আমার প্রচুর সম্পদ, আমি ফিরে গিয়ে আপনাকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে দেব, অনুগ্রহ করে........”

“পাইলট রাও, আপনি আমার কথা অমান্য করতে শুরু করেছেন, আপনাকে কুকুরের মতো গুলি করতে পারি, সেকথা ভুলে যাবেন না।”

ওদিকে মিস্টার রঙ্গনাথন, যাঁর নামও মৃত্যু-তালিকায় রয়েছে, সেদিকে কোনওরকম ভ্রূক্ষেপ না করে সবরকমের ঝুঁকি নিয়ে নিজের কাজ করে চলেছেন। অদ্ভুত রকমের পোশাক পরে রঙ্গনাথন তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। তাঁর মাথায় শুধু একটাই চিন্তা কী করে সময় বাঁচানো যায়। তিনি লেসার দেওয়ালের কাছ দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ দেখতে পেলেন কিছুটা কাদা লেগে তাঁর জুতোর মাথা গলে যাচ্ছে। বুঝতে পেরে দ্রুত সরে এলেন। সরে এসেই বুঝতে পারলেন মৃত্যু খুব কাছে এসে গেছে, আরও তাড়াতাড়ি তাঁদের কাজ করতে হবে। ওদিকে পাইলট রাও মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসেছেন। যে করেই হোক তাঁকে বাঁচতে হবে। পাঁচ-নম্বর লেসার ডিফেন্সে না গিয়ে তিনি ধীরে-ধীরে মহাকাশযান তিন-এর কাছে চলে

এলেন। যে যাঁর প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত৷ একফাঁকে পাইলট ঢুকে পড়লেন যানটির ভেতরে। ফ্লাইট-ডেকে ঢুকতে গিয়ে দেখতে পেলেন একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনি পা টিপেটিপে তার পেছনে গিয়ে বাঁ হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ডান হাত দিয়ে তার ঘাড়ে একটা আঘাত করলেন। একটি আঘাতেই লুটিয়ে পড়ল তার অজ্ঞান শরীর। তাকে পা দিয়ে সরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর তিনি বসে পড়লেন পাইলট সিটে। যোগাযোগরক্ষাকারী একটা সুইচে আঙুল দিয়ে তিনি কথা বললেন। তাঁর কণ্ঠ সমস্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল। “শুভ সন্ধ্যা, ডঃ যোশি, আপনি নিশ্চয়ই আমার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছেন। শুনুন, আমি যদি না যেতে পারি, এখান থেকে জীবন নিয়ে কেউই ফিরতে পারবে না।”

“আমি শুনতে পাচ্ছি পাইলট রাও, আপনি নিজেকে সংযত করুন, এটা হয় না, হতে পারে না”--ডঃ যোশি জানালেন।

“ডঃ যোশি, যদি আমি মারা যাই, আমরা সকলে মারা যাব।” গার্গল করলে যেমন গলা হয়, তেমনই একটা গলা ভেসে এল মাইকে।

ডঃ যোশি বুঝতে পারছেন না কী করবেন। এদিকে খবর আসছে লেসার দেওয়ালের একটা অংশ কাজ করছে না। তারা ঢুকে পড়ছে। অন্যদিকে আর-একটি অংশে দেখা দিচ্ছে ত্রুটি। এদিকে ডেপুটি কমাণ্ডার জানতে চাইছেন মহাকাশযানটিকে আর ক’মিনিটের মধ্যে ছাড়তে হবে।

ডঃ যোশী হেঁটে চলে এলেন স্পেশাল ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। তাঁর নামও রয়েছে মৃত্যু-তালিকায়। “কোনওভাবে কি আমরা ফ্লাইট- ডেকটিকে মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারি না,

মিস্টার বাজপেয়ী? মানে বুঝতেই পারছেন, আমি কীজন্য বলছি।”

“সেটা যে পারা যায় না, তা নয়, কিন্তু দেখতে হবে যাতে ফ্লাইট কন্ট্রোলের কোনওরকম ক্ষতি না হয়।”

“মাপ করবেন, স্যার,” অবন মুখার্জির গলা, “আমি খুব ভাল করে চিনি পাইলট রাওকে, আমি একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

“তুমি আমার ছেলের মতো, দ্যাখো, কিছু করা যায় কি না, কিন্তু আপনিও চেষ্টা করে যান, যে-করেই হোক ওকে ওখান থেকে নামিয়ে আনতেই হবে।” বাক্যটির প্রথম অংশ অবনকে অসহায়ভাবে বলে বাকি অংশটি ইঞ্জিনিয়ারকে জানালেন ডঃ যোশি।

ডঃ যোশি এলেন কর্মরত রঙ্গনাথনের কাছে। তিনি একটা বাক্স খুলে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করছেন। ডঃ যোশি খুব কাতর স্বরে বললেন, “জানি মিস্টার রঙ্গনাথন, আপনার ওপর খুব বেশি চাপ পড়ে যাচ্ছে, তবু কি লেসার-দেওয়ালকে আমরা আর-একটু শক্তিশালী করে তুলতে পারি না? আমি নিজেও ওই কাজে যোগ দিতে চাই, আমি পোশাক পরে আসছি।”

“না, ডঃ যোশি, একাজ আমাদের, আপনি একজন প্রকৃত বিজ্ঞানী, আপনার সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে, তা ছাড়া আপনার বয়স হয়েছে, এ-কাজটা আমাদেরই করতে দিন।”

কথাগুলো শুনে এই মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও ডঃ যোশির বুক ভরে গেল।

পাইলট রাওয়ের চোখের পাতা পড়ছে না। তাঁর চোখ ক্রমশই লাল হয়ে উঠছে। তিনি পাইলট-সিটে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন ভিডিও স্ক্রিনের দিকে। দেখতে পাচ্ছেন কাদার ভেতর দিয়ে উঠে আসছে প্রাণীগুলো, দেখতে পাচ্ছেন রঙ্গনাথন পাঁচ-ছ’জনকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

হঠাৎ পাগলের মতো অট্টহাস্য করে উঠলেন পাইলট রাও। তারপর বলে উঠলেন, “আমি সবাইকে বুঝিয়ে দেব আমি কী। প্রত্যেকে বুঝতে পারবে আমি কত বড়, কত বড় একজন পাইলট, কে বলেছে আমি অপরিহার্য নই?”

“পাইলট রাও, আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?” -- অনেক দূর থেকে যেন ভেসে আসছে কথাগুলো, এরকম মনে হল রাওয়ের।

আসলে দরজার তলার থেকে ভেসে আসছে কথাগুলো। চেতনায় ফিরে এসে পাইলট রাও লাফিয়ে উঠলেন। “ও! তুমি! তোমাকে আমি চিনি না? আমার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে চেয়েছিলে? কী ঔদ্ধত্য!”

কাঁচের ভেতর দিয়ে অবন মুখার্জি দেখলেন যে, পাইলটের হাতে পিস্তল, “ঠিক আছে। আমি ক্ষমা চাইছি পাইলট রাও, কিন্তু আমাকে ভেতরে আসতে দিন, কয়েকটা কথা তো বলা যেতে পারে, আমি আপনার ছাত্রের মতো।”

“তোমার স্থান নরকে, এখানে নয়, যাও, ডঃ যোশিকে বলে দাও, তুমি থেকে যাচ্ছ এখানে, আর আমি চললাম একে উড়িয়ে নিয়ে।”

এদিকে, ইঞ্জিনিয়ার বাজপেয়ী মহাকাশযানটির নীচে দাঁড়িয়ে কাজ করে চলেছেন। তিনি ভাবতেও পারেননি এত তাড়াতাড়ি তাঁর পক্ষে এ-কাজ সম্ভব হয়ে উঠবে। জটিল সব সুইচবোর্ড এবং তার প্যানেলের ওপর সাজানো রয়েছে। তিনি যথা সম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রেখে দুটো কেবল্‌ একসঙ্গে জোড়া দেবার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কোনওরকমে ফ্লাইট-ডেকে অবন মুখার্জি প্রবেশ করতে পারলে ঘটনা অন্য খাতে প্রবাহিত হবে।

মিস্টার রঙ্গনাথনও তাঁর সহযোগীদের নিয়ে পরিশ্রম করে চলেছেন। সবুজ জেলির স্তুপ এগিয়ে আসছে ক্রমশ!

“খুলে গেছে” চিৎকার করে উঠলেন বাজপেয়ী। ডঃ যোশি আনন্দিত মুখে ছুটে এলেন বাজপেয়ীর দিকে। ওপরে ফ্লাইট-ডেকের দরজা খুলে অবন মুখার্জি প্রবেশ করলেন৷ মুহুর্তের মধ্যে ভূতগ্রস্তের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন পাইলট রাও। তাঁর চোখ লাল, মনে হচ্ছে যেন এক্ষুনি ফেটে বেরিয়ে আসবে চোখের মণি।

অবন মুখার্জির বয়স কম। তাঁর হাত কেপে উঠল কিছুক্ষণের জন্য। কী করে এই উদ্ভ্রান্ত মানুষটার ওপর তিনি গুলি চালাবেন বুঝতে পারলেন না। কিন্তু এই দোলাচল অবস্থাই তাঁর জীবনের শেষ ভুল। উদ্ভ্রান্ত পাইলট রাওয়ের এমারজেন্সি পিস্তল থেকে এক টুকরো রশ্মি ছিটকে এল তরুণ অবনের নাকে। অবনের মৃত শরীর লুটিয়ে পড়ল। লুটিয়ে পড়ল সুইচ-বোর্ডের ওপর, যার ফলে পুনরায় কার্যক্ষমতা ফিরে পেল ফ্লাইট-ডেক।

পাগল হয়ে যাবার পূর্ব-মুহুর্তে মানুষ বোধহয় একবার ফের চেতনা ফিরে পায়। অনেকটা সেরকমই ঘটল পাইলট রাওয়ের ক্ষেত্রে। একদিকে মৃত অবনের শরীর আর অন্য দিক থেকে ছুটে আসা দশ-বারো জন, তাদের প্রত্যেকের হাতে মৃত্যুবর্ষী পিস্তল। দিশেহারা পাইলট রাও বুঝতে পারলেন তাঁর আর এ-জীবনে পৃথিবীতে ফিরে যাওয়া হল না। দ্রুত তাঁর হাতের পিস্তল নিজের নাকের কাছে স্থাপন করলেন, এবং ট্রিগার টানলেন।

ডঃ যোশি একটা সিগারেট বের করে ধরালেন। কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন রঙ্গনাথন। মহাকাশযান-তিন উড়ে গেছে এই গ্রহ ছেড়ে। একবার ঘড়ি দেখলেন ডঃ যোশি। পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে। খুব তাড়াহুড়ো করে কোনওরকমে অবনের শরীরটা নামিয়ে আনা গেছে। রাওয়ের মৃত শরীর ফ্লাইট-ডেকেই থেকে গেছে। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ডঃ যোশি বললেন, “মিস্টার রঙ্গনাথন, আমাদের মধ্যে থেকে আর-একজন কিন্তু যেতে পারত, যদি পাইলট রাওয়ের শরীর নামিয়ে আনা যেত।”

রঙ্গনাথন হঠাৎ মৃদু হেসে ডঃ যোশিকে বললেন, “একবার কম্পিউটার চালিয়ে দেখবেন নাকি?”

“কেন বলুন তো?”

“না, এমনিই বলছিলাম, জাস্ট ফর ফান্‌, আমাদের ভেতর থেকে যে যেতে পারত, সেই ভাগ্যবানটির নাম জানতে ইচ্ছে করছে।”

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ডঃ যোশি হেসে ফেললেন। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, “অবশ্যই দেখা যেতে পারে, চলুন।”

ওদিকে রঙ্গনাথনের নির্দেশে পুরোদমে কাজ চলেছে। যে করেই হোক প্রতিরোধ আরও শক্ত করে তুলতে হবে -- এটাই এদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।

আর কিছুক্ষণ পরেই হয়তো এদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়বে মৃত্যুর নিশ্বাস।

ডঃ যোশি ক, খ, গ,র সুইচ-বোর্ডের সামনে এসে বসলেন, সুইচে হাত রাখার সঙ্গে সঙ্গে যে নামটি স্ক্রিনে উঠে এল তা হল “পাইলট-রাও”।

পাশের বাড়ির বন্ধু

লেখক: অনীশ দেব

সেদিন ভোরবেলা জানলা দিয়ে নজর পড়তেই পাপু অবাক হয়ে গেল। পাশের বাড়িটায় লোকজন এসেছে। এতদিন ধরে বাড়িটা খালিই পড়ে ছিল। অনেকটা পোড়ো বাড়ির মতো। আর চেহারাটাও ভারী অদ্ভুত। প্রায় পাঁচতলা উচু গির্জার মতো। ছুঁচলো মাথাটা সোজা আকাশমুখো উঠে গেছে। কিন্তু চেহারায় বড়সড় হলে হবে কী, বাড়িটার চারদিক আগাছার জঙ্গলে ভরে গেছে। সারা গায়ের পলস্তরা খসে গেছে। জানলাগুলোর হালও সেইরকম। রাত্তিরে দেখলে গা-ছমছম করে পাপুর। অন্ধকার কালো-কুচকুচে দেখায় বাড়িটা৷ একটা তালঢ্যাঙা ভূত যেন টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দিনের বেলা দেখলে অবশ্য অতটা ভয় করে না। তবে ইস্কুল যাবার পথে পাপু রোজই বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে। চার পাশে মরচেধরা লোহার রেলিং। বিশাল লোহার গেট। তার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় বাড়িটার ভারী সদর দরজা। বন্ধ। আর নীচের দিকটা ঢাকা পড়ে গেছে আগাছায়।

বাড়িটা যে কবে কে তৈরি করেছে তা কেউ জানে না। বাবাও না। পাপু বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল। তাতে বাবা বলেছেন, “এদিকে সবই তো নতুন ফ্যাক্টরি-কোয়ার্টার। কী করে একটা পোড়ো বাড়ি মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে কে জানে! হবে হয়তো কোনও সাহেবসুবোর ফেলে যাওয়া বাড়ি।”

উত্তরটা পাপুর মনে ধরেছিল। কারণ সত্যিই এ-অঞ্চলের প্রায় সব বাড়িই নতুন। বছর দশেক হল কয়েকটা বড়-বড় কলকারখানা চালু হওয়ায় নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। হয়েছে ইস্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, দোকানপাট সবকিছু, অথচ একই সঙ্গে রয়েছে সবুজ মাঠ, ফুলের বাগান, গাছপালা। আর তারই মাঝে-মাঝে সুন্দর-সুন্দর ছোট-ছোট নতুন বাড়ি। ব্যতিক্রম শুধু আগাছায় ভরা ফাঁকা জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পোড়ো বাড়িটা।

সেই বাড়িতেই নতুন লোক এসেছে।

পাপু তাড়াতাড়ি বাবাকে ডেকে নিয়ে এল জানলার কাছে। বলল, “ওই বাড়িটায় নতুন লোক এসেছে, বাবা।”

বাবা ফ্যাক্টরিতে বেরোনোর জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। পাপুর কথায় উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “না, দেখতে পাচ্ছি না। যাকগে, পরে নিশ্চয়ই আলাপ হয়ে যাবে।”

বাবা অফিসে বেরিয়ে যাবার পর মা’কে ধরে নিয়ে এল পাপু। বলল, “মা, ওই দ্যাখো! ও বাড়িটায় লোক এসেছে।”

মা ভাল করে তাকিয়ে রইলেন পোড়ো বাড়িটার ভাঙা জানলার দিকে। কিন্তু না, কোনও মানুষজনই নজরে পড়ল না। তখন মা বললেন, “ঠিক আছে, এখন রান্না বসাই গিয়ে, পরে আবার দেখব। তুমি পড়তে বস। এখন দেরি করলে আবার স্কুলের দেরি হয়ে যাবে।”

মা চলে গেলেন। পাপু বুঝল, মা কিংবা বাবা, দু’জনের কেউই ওর কথাকে বিশেষ আমল দেননি। নেহাতই কথার পিঠে দুটো কথা বলে চলে গেছেন। পাপুর একটু রাগও হল। বড়রা সব সময়েই এইরকম। ছোটদের গ্রাহ্যই করতে চান না। পাপু বই নিয়ে পড়তে বসল বটে, কিন্তু ওর চোখ বরাবরই ছুটে যেতে লাগল ওই পোড়ো বাড়ির জানলাগুলোর দিকে। এতদিনের পুরনো ভাঙাচোরা বাড়িটা হঠাৎই কারা ভাড়া নিল, নাকি কিনে নিল? পাপুর বেশ অবাক লাগছিল।

ইস্কুলে রওনা হওয়ার ঠিক আগেই আশ্চর্য ঘটনাটা ওর চোখে পড়ল।

যে জানলা দিয়ে পাপু নজর রাখছিল, তার কিছুটা অংশ একটা নিমগাছের ডাল-পালা-পাতায় ঢাকা। তা ছাড়া পোড়ো বাড়িটার তেতলার জানলাটা খুব একটা যে কাছে তাও নয়। কিন্তু তবুও পাপুর দেখতে কোনও অসুবিধে হল না।


তেতলার জানলা দিয়ে একটা ছোট বাক্সমতো কী যেন পড়ে গেল নীচের আগাছার জঙ্গলে। আর তার ঠিক পরেই একজন লোক গরাদভাঙা জানলা দিয়ে বাইরে উঁকি মারল। নীচে তাকিয়ে কিছুক্ষণ কী সব দেখল। আশপাশে একবার চোখ বুলিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর ‘স্পাইডারম্যান’ কমিকস-এর পিটার পার্কারের মতো পোড়ো বাড়িটার দেওয়াল বেয়ে তরতর কে হেঁটে নেমে এল নীচে। বাক্সটা খুঁজে নিয়ে আবার একইভাবে তেতলায় উঠে জানলা দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।

বলতে গেলে পাপুর দম আটকে আসছিল। ও একছুটে গিয়ে নতুন আনন্দমেলা পত্রিকাটা নিয়ে “স্পাইডারম্যান” কমিক্স্‌-এর পাতা খুলে বসল। পিটার পার্কারের ছবিটা একদৃষ্টে দেখতে লাগল। তা হলে কি পাশের বাড়িতে কোনও মাকড়সা-পরিবার এসে উঠেছে? পার্কারের গল্প তা হলে গল্প নয়! পাপু ভাবল মা’কে ডেকে এক্ষুনি এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা জানায়। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, মা’কে বলে লাভ নেই, মা পাপুর কথা একটুও বিশ্বাস করবেন না।

বলবেন, “ও তোমার চোখের ভুল। আর রাজ্যের গল্পের বই পড়ার নেশাটা একটু কমাও তো!”

সুতরাং এই দুর্দান্ত অভিজ্ঞতার কথা অতিকষ্টে বুকে চেপে পাপু ইস্কুলে চলে গেল।

কিন্তু সেখানে গিয়ে আর গোপন রাখতে পারল না। প্রাণের বন্ধু বিজনকে সব খুলে বলল ও। বিজন কাছাকাছিই একটা কোয়ার্টারে থাকে। রোজ বিকেলে আরও সব বন্ধুবান্ধব মিলে ওরা পাপুদের বাড়ির কাছে মাঠে খেলা করে । বিজন বলল, “চল্‌, বিকেলে খেলার সময় বাড়িটার দিকে নজর রাখব।”

যে কথা, সেই কাজ।

বিকেলে খেলতে বেরিয়ে পাপু, বিজন, আর ওদের অন্য বন্ধুরা বাড়িটার দিকে নজর রাখতে লাগল। চট করে কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল না বাড়িটায় কেউ আছে। খেলাধুলো ছেড়ে যখন ওরা গোয়েন্দাগিরিতে নামবে বলে মতলব আঁটছে, ঠিক তখনই বাড়ির দরজাটা খুলে গেল। আর বেরিয়ে এল ওদেরই বয়েসি একটি ছেলে। ফুটফুটে, হাসিখুশি মুখ।

বড় লোহার গেটটা খুলে সে সোজা এগিয়ে এল পাপুদের কাছে। বলল, “আমার নাম রনি। আমি তোমাদের সঙ্গে খেলব। তোমাদের নাম কী?”

পাপু, বিজন, সবাই যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তোতলানো স্বরে আলাপ সেরে নিল নতুন বন্ধুর সঙ্গে। কথায়-কথায় জানা গেল, রনিরা আজ খুব ভোরে এসেছে। এ-বাড়িটা ওদেরই ছিল। তবে এদিকে আসা হয়নি। হঠাৎ দরকার পড়ায় বাবা-মা-রনি হঠাৎ করে চলে এসেছে।

তখনও বেশ দিনের আলো ছিল। ওরা দল করে টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতে লাগল। খেলা শুরু হলেও পাপুর বার বার সকালের ঘটনার কথা মনে পড়ছিল। দেওয়াল বেয়ে নেমে-আসা ওই ভদ্রলোক নিশ্চয়ই রনির বাবা। রনিকে জিজ্ঞেস করবে সে-কথা? নাকি...

পাপু একপাশে বসে স্কোর লিখছিল আর এলোমেলো ভাবছিল। তখন রনি ব্যাট করছে, বিজন বল করছে অন্য প্রান্তে রয়েছে ওদেরই আর-এক বন্ধু তাতন। কেউ একজন আউট হলেই পাপু নামবে ব্যাট হাতে। কিন্তু হঠাৎই রনি বলটাকে ওপরের দিকে মারল। মারতে গিয়ে খুব যে একটা জোর খাটিয়েছে, তা মনে হল না। কিন্তু বলটা সেই যে সোজা ওপরের দিকে উঠে গেল আর নীচে পড়ল না।

রনি মুখে অপরাধী ভাব ফুটিয়ে বলল, “কিছু-মনে কর না। মারটা একটু জোরে হয়ে গেছে।”

বিজন অবাক হয়ে একবার আকাশের দিকে, আর-একবার রনির দিকে দেখতে লাগল। ঘটনাটা ওদের বন্ধুরা কেউই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

মাঝপথে খেলা পণ্ড। সুতরাং ওরা গল্প করতে করতে যে-যার বাড়ির দিকে চলল। পাপু রনিকে বলল, “আমি পাশের বাড়িতেই থাকি।”

রনি সেটা শুনে বলল, “আমাদের বাড়িতে একদিন বেড়াতে এলো মা বাবা তোমাকে দেখলে ভীষণ খুশি হবে। কাল আসবে না কি?”

পাপু বলল, “ঠিক আছে। মা যদি বারণ না করে তা হলে আসব।”

রনি হাত নেড়ে লোহার গেট দিয়ে ঢুকে পড়ল । তারপর- পাপু স্পষ্ট দেখল, মরচেধরা লোহার গেটটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। অথচ রনি একটিবারও পিছন ফিরে তাকায়নি। ও তখন সদর-দরজা ঠেলে বাড়িতে ঢুকছে।

সদর-দরজাটাও একই ভাবে বন্ধ হয়ে গেল।

যদিও তখন সন্ধের আঁধার নেমে আসছে, তবুও পাপুর যে দেখতে এতটুকু ভুল হয়নি তা ও হলফ করে বলতে পারে।

বাড়িতে ঢোকার মুখে ও আবার দেখল, রনিদের বাড়ির সব কটা জানলায় একসঙ্গে দপ করে আলো জ্বলে উঠল। আলোগুলোর রঙ কেমন যেন অদ্ভুত। এরকম আলো পাপু আগে কখনও দ্যাখেনি। তা ছাড়া ওই বাড়িতে এত আলোর ব্যবস্থা ছিল!

পাপু ঠিক করল, বিশ্বাস করুক আর না করুক, আজ ও মা-বাবাকে সব খুলে বলবে। আর কাল বিকেলে ও রনিদের বাড়িতে বেড়াতে যাবে।

অদ্ভুত সব চিন্তা মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাওয়ার দরুন পড়াশোনায় ঠিকমতো মন বসল না পাপুর। শেষে রাতে খাওয়ার সময় ও মা’কে আর বাবাকে রনিদের কথা বলল। কোনও কথাই বাদ দিল না।

ওর কথা শুনে বাবা তো গলা ফাটিয়ে হেসে উঠলেন। “এসব তোমার কমিকস্‌ পড়ার ফল। ভাল করে রাত্তিরে ঘুমোও, দেখবে কাল সকালেই সব ঠিক হয়ে গেছে।”

পাপু বলল, “না বাবা, সব সত্যি। আমি নিজের চোখে দেখেছি। বিশ্বাস করো।”

তখন মা বললেন, “ঠিক আছে, কাল বিকেলে তোমাকে নিয়ে আমরা রনিদের বাড়িতে বেড়াতে যাব। তোমার বাবাও যাবে আলাপ করতে। দেখবে, তখন তোমার ভুল ভেঙে যাবে।”

পাপু আর কী করে, চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়ল।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে ওর মনে হল, ওইসব উদ্ভট ব্যাপারগুলো ঠিক-ঠিক ও দেখেছিল তো! নাকি ....

সে-রাতে পাপু স্পাইডারম্যান কমিকস্-এর পিটার পার্কারকে স্বপ্ন দেখল।

পরদিন সকালে উঠে শুধু পাপু নয়, মা-বাবাও একেবারে তাজ্জব। ভেলকিবাজি, ভানুমতীর খেল্‌, নাকি ময়দানবের কীর্তি? সবাই দু’চোখ কচলে বারবার দেখতে লাগল আশ্চর্য ঘটনাটা।

রনিদের বাড়িটা সূর্যের আলোয় যেন ঝকঝক করছে। কোনও দিন যে সেটা পোড়ো বাড়ি ছিল সেটা বিশ্বাস-করাই এখন মুশকিল।

পাপু মা-বারবার গোল-গোল চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী, এখন বিশ্বাস হল তো আমার কথা! দেখলে তো রনিরা কী রকম সব আশ্চর্য কাণ্ড করতে পারে!

মা কোনওরকমে থেমে থেমে বললেন, “এ যে একেবারে নতুন বাড়ি।”

বাবা বাড়ির চারপাশের আগাছার জঙ্গলের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “শুধু ওই জঙ্গল আর মরচেধরা লোহার রেলিংগুলো না থাকলে বাড়িটা আর চেনাই যেত না।”

পাপু আগ্রহভরা গলায় বলল, “রনিকে একবার ডেকে জিজ্ঞেস করব বাবা?”

মা তাড়াতাড়ি বাধা দিলেন, “না, না, তার দরকার নেই। শেষ পর্যন্ত কী থেকে কী হবে!”

বাবা সাবধানী সুরে পাপুকে বললেন, “তুমি যেন একা-একা ওদের বাড়িতে যেও না।”

পাপু ঘাড় নাড়ল। তারপর হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসল।

বাবা ফ্যাক্টরিতে বেরোনোর পর থেকেই পাপু জানলার কাছে সর্বক্ষণ খাড়া হয়ে রইল। তীক্ষ্ণ নজর চালিয়ে রনিদের বাড়ির ভেতরটা দেখতে চেষ্টা করল। কিন্তু কোনও লাভ হল না। রনি, ওর বাবা কিংবা মা, কাউকেই দেখা গেল না। পাপু অবাক হয়ে ভাবছিল, কোন শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় বাড়িটা তাড়াতাড়ি রং বদলে ফেলল।

উত্তরটা ও পেল ইস্কুলে যাবার সময়।

পাপু একা-একাই ইস্কুলে যায়-আসে৷ এদিককার রাস্তাঘাটে গাড়িঘোড়া কম। শুধু একটু যা সাইকেলের ভিড় রয়েছে। ও সবে রনিদের বাড়িটা ছাড়িয়ে এগিয়েছে, এমন সময় ওর ঠিক সামনে হাজির হল রনি। যেন বাতাস থেকেই ফুটে উঠল ওর নতুন বন্ধুর চেহারা।

“কোথায় যাচ্ছ, ইস্কুলে?” রনি জিজ্ঞেস করল।

পাপু নিজেকে সামলে নিয়ে কিছুটা ভয়ে-ভয়েই বলল, “হ্যাঁ।” তারপর একটু থেমে আবার বলল, “তুমি ইস্কুলে ভর্তি হবে না?”

রনি হাসল। হেসে বলল, “না। আমি তো দেশের বাড়িতে ইস্কুলে পড়ি। তোমাদের এখানে ইস্কুল-কলেজে যা শেখায়, সব আমার জানা। আমাদের ইস্কুলে পড়া খুব কঠিন। তুমি বুঝবে না।”

পাপু কিছুটা অপমান বোধ করল। বলল, “তোমার দেশের বাড়ি কোথায়?”

রনি হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল, “সে অনেক দূর। জায়গার নাম বললে তুমি চিনবে না।”

পাপু কথা বলতে বলতে এগোচ্ছিল। রনিও ওর পাশে-পাশে হাঁটছিল। ইস্কুলের কাছাকাছি এসে পাপু বলল, “আচ্ছা, তোমাদের বাড়িটা রাতারাতি কে মেরামত করল বলো তো?”

রনি স্বাভাবিক গলায় বলল, “কে আবার! বাবা।”

“একা?”

“হ্যাঁ, একা। কেন ?”

“তোমার বাবা দেওয়াল বেয়ে হাঁটতে পারেন?”

পাপু রনিকে খোঁচা দিয়ে অপমানের শোধ নিতে চাইছিল, কিন্তু ওর কথায় রনি আগের মতোই স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিল, “শুধু বাবা কেন? মা’ও পারে, আমিও পারি৷ দেখবে?” বলেই রনি একছুটে সামনের একটা কোয়ার্টারের দেওয়াল বেয়ে দোতলায় উঠে গেল, তারপর একই ভাবে আবার নেমে এল।

পাপু হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেখে রনি বলল, “শুধু আমি কেন, আমাদের দেশের সবাই পারে। তুমি বিকেলে আমাদের বাড়িতে এসো, তোমাকে আরও সব অদ্ভুত-অদ্ভুত জিনিস দেখাব। খুব মজা পাবে তুমি।”

পাপুর সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। কী ভেবে ও কোনওরকমে বলল, “সন্ধেবেলা যাব। আমার মা-বাবাকে নিয়ে যাব। নইলে একা-একা আমাকে ছাড়বে না।”

রনি হেসে বলল, “নিয়ে এসো ওঁদের। আলাপ হলে আমার মা-বাবাও খুব খুশি হবে। আমাদের দেশের বাড়ির দারুণ-দারুণ সব গল্প শোনাব। আচ্ছা, ওই যে তোমার ইস্কুল এসে গেছে, আমি এখন যাই। সন্ধেবেলা আবার দেখা হবে।”

পাপুর চোখের সামনে রনি আবার যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। ইস্কুলে বিজনকে সব ঘটনা জানাতেই ও বলল, “সন্ধেবেলা যাবি যা, তবে সাবধানে থাকিস।”

পাপু গম্ভীর হয়ে ভাবছিল। ক্লাসের পড়া ওর মাথায় ঢুকছিল না। ইস্কুল থেকে বাড়ি ফিরে আর খেলতে বেরোল না পাপু। শুধু মায়ের কাছে বসে জেদ ধরল রনিদের বাড়িতে ওকে নিয়ে যেতে হবেই। কারণ রনি কত মজার-মজার খেলা দেখাতে পারে, পড়াশোনায় কত ভাল, ও পাপুকে নিশ্চয়ই সব শিখিয়ে দেবে। তা ছাড়া রনির কাছে ওর দেশের গল্প শুনবে পাপু। রনি বলেছে দারুণ-দারুণ সব গল্প শোনাবে।

বাবা অফিস থেকে ফিরেই রাজি হয়ে গেলেন এক কথায়। মনে মনে তাঁরও বোধহয় খুব কৌতুহল হচ্ছিল। সুতরাং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনজন তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলেন বাড়ি থেকে।

বিকেল পেরিয়ে তখন সন্ধে হয়ে গেছে। রনিদের তালঢ্যাঙা বাড়ির ছোট ছোট জানালায় গতকালের মতই অদ্ভুত আলো জ্বলছে। মা-বাবার হাত ধরে লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল পাপু। তারপর আগাছা মাড়িয়ে সদর-দরজা। দরজা খুলে ভেতরে।

ভেতরে ঢুকতেই মেঝেটা নিঃশব্দে ওপরে উঠতে লাগল। ঠিক যেন অটোমেটিক লিফট। তারপরই রনি আর ওর মা-বাবার দেখা পাওয়া গেল। বিশাল ঘর। অনেকগুলো টিভির পর্দায় নানান রঙিন লেখা। তাদের সামনে অসংখ্য রঙিন বোতাম। কম্পিউটার নাকি? পাপু কম্পিউটারের ছবি বইতে দেখেছে।

রনির বাবা দ্রুত হাতে নানান বোতাম টেপাটেপি করছিলেন, ওদের দেখেই হেসে অভ্যর্থনা জানালেন। রনির মা সুন্দর-সুন্দর খাবার সাজিয়ে দিলেন প্লেটে। ওরা আনন্দে গল্প করতে লাগল । রনিদের দেশের হরেকরকম অদ্ভুত গল্প পাপুদের অবাক করে দিচ্ছিল। রনির বাবা বারবার করে বললেন, “চলুন না, আমাদের দেশে ক’দিন বেড়িয়ে আসবেন। কোনও অসুবিধে হবে না। আজ রওনা হলে ধরুন কাল পৌঁছে যাবেন। আর যদি বলেন তো পরশু আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাব। চলুন, চলুন। গেলে খুব ভাল লাগবে। তা ছাড়া আমাদেরও কটা দিন বেশ ফুর্তিতে কাটবে।”

পাপু আর রনি ছুটোছুটি করে খেলছিল। পাপু নেমন্তন্নের কথা শুনে বাবাকে আর মা’কে রাজি করানোর জন্য বারবার করে আর্জি পেশ করতে লাগল। সকলের অনুরোধে ওঁরা শেষ পর্যস্ত রাজি হলেন।

তখন রনির বাবা হেসে বললেন, “তা হলে আর দেরি নয়, এখনই রওনা হওয়া যাক।” বলে তিনি কম্পিউটারের কাছে গিয়ে পরপর কয়েকটা বোতাম টিপলেন।

একটা গুড়গুড় শব্দ শুরু হল । তারপর ভোঁ-ভোঁ। শেষে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে রনিদের গোটা বাড়িটা শূন্যে উঠতে লাগল রকেটের মতো।

পাপুর মা চিৎকার করে উঠলেন।

বাবা বললেন, “এসব কী হচ্ছে!”

রনির বাবা হেসে বললেন, “কোনও ভয় নেই। আমরা আপনাদের এপসিলন এরিড্যানির সতেরো নম্বর গ্রহে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানেই আমাদের দেশ। পৃথিবী থেকে সাড়ে দশ আলোকবর্ষ দূরে। যেটাকে আপনারা আমাদের বাড়ি ভাবছেন, সেটা আসলে একটা মহাকাশযান৷ অনেকদিন আগে পৃথিবীতে এসে বিকল হয়ে পড়েছিল। অন্য একটা মহাকাশযান আমাদের এখানে পৌঁছে দিয়ে গেছে এই মহাকাশযানটাকে মেরামত করে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাই এখন নিয়ে যাচ্ছি।”

রনির মা বললেন, “আমরা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার চেষ্টাতেই বারবার এই গ্রহে যাতায়াত করি। এবছরে আপনাদের পাপুর সঙ্গে আমাদের রনির যা ভাব হয়েছে তাতে আমরা খুব খুশি। তা ছাড়া আপনাদের সঙ্গেও আলাপ করে খুব ভাল লেগেছে। মিছিমিছি ভয় পাবেন না। মনে করুন না, ছুটিতে ক’দিন... কোথাও বেড়াতে যাচ্ছেন! মাত্র কয়েকটা তো দিন, তার বেশি তো নয়।”

পাপুর মা-বাবার ভয় আস্তে-আস্তে কেটে যাচ্ছিল। রকেটযান তখন সাঙ্ঘাতিক গতিতে ছুটে চলেছে। সামনের টিভি-পর্দাগুলোয় অসংখ্য তারা দেখা যাচ্ছে।

রনি ঘরের দেওয়ালে ছাদে ইচ্ছেমতো ছুটোছুটি করছিল। খেলা করছিল পাপুর সঙ্গে। পাপু কিন্তু এতটুকু ভয় পায়নি। সেও খেলা করতে করতে লাফিয়ে-লাফিয়ে রনিকে ছুঁতে চেষ্টা করছিল।

সেদিকে তাকিয়ে পাপুর বাবা রনির বাবাকে বললেন, “বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন চলুন, কিন্তু দেওয়ালে হাঁটাহাঁটিটা আমাকে অবশ্যই শিখিয়ে দিতে হবে।”

পাপুর মা বললেন রনির মা’কে, “আমাকে নতুন-নতুন কয়েকটা রান্না শিখিয়ে দেবেন, দিদি।”

কথা শেষ হতে সকলের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

ছবি : সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়